সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২৪ নভেম্বর স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক উত্তরণ ঘটার কথা রয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও টেকসই উত্তরণের পথে বাংলাদেশ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে সামনে রয়েছে একাধিক চ্যালেঞ্জÑ আর্থিক খাতের দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, রপ্তানির ঝুঁকি, জলবায়ু ঝুঁকি, যুব বেকারত্ব এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে রাজনৈতিক উত্তাপ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় রাজনৈতিক শূন্যতা কেটেছে। কিন্তু ব্যবসায়ী মহল চায়, এলডিসি উত্তরণ তিন থেকে ছয় বছর পিছিয়ে দেওয়া হোক।
আট বছরের প্রক্রিয়া, সামনে মাত্র ৯ মাস
দীর্ঘ আট বছরের প্রক্রিয়া ও একাধিক মূল্যায়নের পর জাতিসংঘ সিদ্ধান্ত দিয়েছে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ এলডিসি তালিকা থেকে বের হবে। সে হিসাবে হাতে সময় আছে মাত্র ৯ মাস। উত্তরণ হলে রপ্তানি খাতে প্রভাব পড়তে পারে, বিশেষ করে ওষুধশিল্প বড় চ্যালেঞ্জে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, উত্তরণ বিলম্বিত (ডেফার) করার জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সঙ্গে সমন্বয় করে এ বিষয়ে দ্রুত কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের দাবিকে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, বাড়তি সময় চেয়ে ইতোমধ্যে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) কাছে আবেদন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ নিট পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, ২০২৩ সাল থেকেই তারা উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন। তার ভাষ্য, ‘নতুন সরকারকে বলতে হবে, আগের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে নতুন পথনকশা তৈরির জন্য সময় প্রয়োজন।’
জাতিসংঘে কীভাবে হবে প্রক্রিয়া
গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেন, বাংলাদেশের আবেদন প্রথমে সিডিপির বৈঠকে পর্যালোচিত হবে। কমিটির সুপারিশের পর বিষয়টি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে অনুমোদনের জন্য উঠতে পারে। সেই বৈঠক এ সপ্তাহে হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে সদস্য দেশগুলোর সমর্থন প্রয়োজন হবে।
এর আগে সলোমন দ্বীপপুঞ্জ গৃহযুদ্ধ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণ দেখিয়ে উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। সুনামির কারণে মালদ্বীপ এবং ভূমিকম্পের কারণে নেপালের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত সময়ে উত্তরণ হয়নি।
কীভাবে নির্ধারিত হয় উত্তরণ
তিন বছর পর পর এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর ত্রিবার্ষিক মূল্যায়ন করা হয়। তিনটি সূচকÑ মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক ও জলবায়ু ভঙ্গুরতার ভিত্তিতে উত্তরণের যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়। যে কোনো দুটি সূচকে উত্তীর্ণ হলে অথবা মাথাপিছু আয় নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণ হলে উত্তরণের সুপারিশ করা হয়।
বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে এলডিসি তালিকাভুক্ত হয়। ২০১৮ ও ২০২১ সালের মূল্যায়নে তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়ে ২০২১ সালে চূড়ান্ত সুপারিশ পায়। করোনার কারণে প্রস্তুতির জন্য দুই বছর অতিরিক্ত সময় দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞরা জানান, এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশ নির্ধারিত সূচকের অনেক ওপরে আছে। পেছাতে গেলে সবার আগে সরকারের সিদ্ধান্ত বদলাতে হবে। উপদেষ্টা পরিষদ গত বছরের মার্চে উত্তরণের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা পাল্টিয়ে এখন নতুন করে বলতে হবে যে দেশে অভাবিত ঘটনা ঘটেছে, যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। এ ছাড়া সিডিপিতে পাঠানো বাংলাদেশের প্রতিবেদন প্রত্যাহার করতে হবে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ১৯২টি দেশের মধ্যে ভোটাভুটির জন্যও আবেদন পাঠানোর প্রয়োজন হতে পারে।
সম্ভাব্য প্রভাব : রপ্তানি ও ওষুধশিল্পে চাপ
এলডিসি থেকে বের হলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে রপ্তানিতে। তৈরি পোশাক খাতে আপাতত বড় ঝুঁকি নেই। কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়নে ২০২৯ সাল পর্যন্ত শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রে শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা না থাকলেও বড় দুই বাজারে আপাত স্বস্তি রয়েছে।
তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই সুবিধা শেষ হলে নিয়মিত শুল্ক আরোপ হবে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাড়তি শুল্কের কারণে বছরে প্রায় ৫৩৭ কোটি ডলার রপ্তানি কমতে পারে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জে পড়তে পারে ওষুধশিল্প। বর্তমানে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত এলডিসিভুক্ত দেশগুলো ওষুধের মেধাস্বত্ব (আইপিআর) সংক্রান্ত কিছু ছাড় পেয়ে থাকে। কিন্তু উত্তরণের পর এই সুবিধা আর প্রযোজ্য হবে না, ফলে উৎপাদন ব্যয় ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় চাপ তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া উত্তরণ হলে সহজ শর্তের বৈদেশিক ঋণ পাওয়ার সুযোগও সীমিত হতে পারে, কারণ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে তুলনামূলক বেশি সক্ষম অর্থনীতি হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
ইতিবাচক দিকও আছে
তবে এলডিসি উত্তরণের বড় একটি ইতিবাচক দিক রয়েছে। এতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। ‘স্বল্পোন্নত’ দেশের তকমা ঘুচে গিয়ে দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাবে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রতিফলন।
ফলে বলা যায়, এলডিসি উত্তরণ এখন বাংলাদেশের জন্য একদিকে গৌরবের বিষয়, অন্যদিকে প্রস্তুতির বড় পরীক্ষা। সিদ্ধান্ত যাই হোক, সামনে সময় খুবই সীমিতÑ আর সেই সময়কে কার্যকরভাবে কাজে লাগানোই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
