বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬
Logo
×
বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ: সম্ভাবনার জানালা কতটা কাজে লাগছে

শাহিন শাহ, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:৩৩ অপরাহ্ন

বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক জনসংখ্যাগত পর্যায়ে অবস্থান করছে, যা অর্থনীতির জন্য বিরল সুযোগ তৈরি করেছে। বয়স কাঠামোর পরিবর্তনের ফলে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত বেড়েছে এবং নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর হার তুলনামূলকভাবে কমেছে। অর্থনীতির পরিভাষায় একে বলা হয় ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড। নীতিনির্ধারক ও গবেষকদের মতে, এই সময়টিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে দেশের প্রবৃদ্ধি আরও গতিশীল ও টেকসই হতে পারে।

সরকারি পরিসংখ্যান ও আন্তর্জাতিক সংস্থার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। গত দুই দশকে প্রজনন হার কমে আসা এবং গড় আয়ু বৃদ্ধির ফলে এই কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটেছে। এর ফলে শ্রমবাজারে বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বৃহৎ শ্রমশক্তিকে দক্ষ ও প্রযুক্তি-সমৃদ্ধ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে পারলে শিল্পায়ন, সেবা খাত, তথ্যপ্রযুক্তি ও রপ্তানিমুখী অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব। বিশেষ করে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রেক্ষাপটে ডিজিটাল দক্ষতা, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা সংস্কৃতি জোরদার করা জরুরি হয়ে উঠেছে। তরুণ জনগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড সরাসরি জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারে।

তবে বাস্তব চিত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও স্পষ্ট। শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার উদ্বেগজনক। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়লেও তা এখনো চাহিদার তুলনায় সীমিত। ফলে দক্ষতার ঘাটতি শ্রমবাজারে একটি কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে।

নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণও ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পোশাক শিল্প ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাতে নারীর উপস্থিতি বেড়েছে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে নারীর শ্রমবাজার অংশগ্রহণের হার এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে নয়। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সামাজিক সহায়তা কাঠামো জোরদার করা গেলে অর্থনীতিতে নারীর অবদান আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

গবেষকদের মতে, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড একটি সময়-সীমিত সুযোগ। আগামী এক থেকে দুই দশকের মধ্যে জনসংখ্যার বয়স কাঠামো আবার পরিবর্তিত হবে এবং প্রবীণ জনগোষ্ঠীর অনুপাত বাড়তে শুরু করবে। তাই এই সময়ের মধ্যে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনীতিকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানো জরুরি।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে কেবল একটি পরিসংখ্যানগত বাস্তবতা হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক রূপান্তরের কৌশলগত সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সুশাসন, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে কার্যকর বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে এই জনসংখ্যাগত বাস্তবতা দেশের জন্য আশীর্বাদে পরিণত হতে পারে। অন্যথায়, বিপুল যুবসমাজের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ তৈরি করতে পারে।

শেয়ার করুন:
লিঙ্ক কপি হয়েছে
Loading
আরও নিউজ লোড হচ্ছে...