বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬
Logo
×
পাক-আফগান যুদ্ধ

পাকিস্তান–আফগানিস্তান সীমান্ত উত্তেজনা: সন্ত্রাসবাদ, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির জটিল সমীকরণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:২৯ পূর্বাহ্ন

দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার ভূরাজনৈতিক মানচিত্রে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই অবিশ্বাস, সীমান্তবিরোধ ও নিরাপত্তা-সংকট দ্বারা চিহ্নিত। ২০২১ সালে Taliban আফগানিস্তানে ক্ষমতায় ফেরার পর ইসলামাবাদ ও কাবুলের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পায়। প্রথমদিকে পারস্পরিক সহযোগিতার প্রত্যাশা থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্তে সংঘর্ষ, বিমান হামলা ও কূটনৈতিক উত্তেজনা দুই দেশের সম্পর্ককে আবারও অস্থির করে তুলেছে।

পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগান ভূখণ্ডে অবস্থানরত Tehrik-i-Taliban Pakistan (টিটিপি) তাদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। ইসলামাবাদ দাবি করে, টিটিপি সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। অপরদিকে আফগান তালেবান সরকার সরাসরি এসব অভিযোগ অস্বীকার না করলেও বলছে, তারা অন্য দেশের বিরুদ্ধে নিজেদের মাটি ব্যবহার করতে দেবে না—তবে পাকিস্তানের একতরফা বিমান হামলা ও সীমান্তে গোলাবর্ষণকে তারা সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে।

দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত ডুরান্ড লাইন সীমান্তও উত্তেজনার অন্যতম উৎস। আফগানিস্তানের অনেক রাজনৈতিক গোষ্ঠী ঐতিহাসিকভাবে এই সীমারেখাকে আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে সীমান্তে কাঁটাতার নির্মাণ, চেকপোস্ট স্থাপন ও নিরাপত্তা তৎপরতা প্রায়ই সংঘর্ষের রূপ নেয়।

ভূরাজনৈতিকভাবে এই উত্তেজনার প্রভাব আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ওপরও পড়ছে। পাকিস্তান ঐতিহ্যগতভাবে আফগানিস্তানে প্রভাব বজায় রাখতে চাইলেও তালেবান সরকারের স্বাধীন কূটনৈতিক অবস্থান ইসলামাবাদের প্রত্যাশার সঙ্গে সবসময় সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একই সময়ে চীন, রাশিয়া ও ইরান আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতা নিয়ে কৌশলগত হিসাব কষছে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এবং সিপেক প্রকল্পের নিরাপত্তা পাকিস্তানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; ফলে সীমান্তে সন্ত্রাসী তৎপরতা বাড়লে তা সরাসরি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটও এই উত্তেজনাকে প্রভাবিত করছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি সরকারের ওপর চাপ বাড়ায়, আর সীমান্ত-সংঘাত কখনও কখনও অভ্যন্তরীণ সমর্থন সংগঠনের উপাদান হয়ে ওঠে। অন্যদিকে আফগান তালেবান আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও অর্থনৈতিক সহায়তা পেতে চাইলেও সীমান্তে সংঘর্ষ তাদের কূটনৈতিক অবস্থানকে জটিল করে তোলে।

মানবিক দিক থেকেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী সাধারণ মানুষ গোলাগুলি, স্থানচ্যুতি ও বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ার শিকার হচ্ছেন। তোরখাম ও চামান সীমান্তপথে বাণিজ্য বন্ধ বা সীমিত হলে দুই দেশের অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে।

বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ বলা না গেলেও “লো-ইনটেনসিটি কনফ্লিক্ট” বা নিম্নমাত্রার সংঘর্ষের বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট। পারস্পরিক অবিশ্বাস, জঙ্গিগোষ্ঠীর উপস্থিতি এবং সীমান্তের ঐতিহাসিক বিরোধ পরিস্থিতিকে দ্রুত অবনতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। তবে একই সঙ্গে উভয় দেশই জানে, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ তাদের অর্থনীতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বিপর্যয়কর হবে।

কূটনৈতিক সংলাপ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় যৌথ প্রক্রিয়া এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া এই উত্তেজনা দীর্ঘমেয়াদে কমবে না—এমনটাই মত বিশ্লেষকদের। দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা-পরিসরে পাকিস্তান–আফগানিস্তান সম্পর্ক তাই শুধু দ্বিপাক্ষিক ইস্যু নয়; এটি বৃহত্তর আঞ্চলিক ভারসাম্য ও শক্তির রাজনীতির অংশ।

শেয়ার করুন:
লিঙ্ক কপি হয়েছে
Loading
আরও নিউজ লোড হচ্ছে...