বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬
Logo
×

ফাতেমার অবদান ভোলেননি তারেক রহমান

প্রথম সমাচার ডেস্ক ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:০৫ অপরাহ্ন

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের সবচেয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টানা দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে তার পাশে অবিচল থেকেছেন ফাতেমা। নিজের আনুগত্য ও সততার বদৌলতে গৃহকর্মী থেকে হয়ে ওঠেন খালেদা জিয়ার ‘ঘরের লোক’।

আপসহীন নেত্রীর পাশে যখন পরিবারের সদস্যদেরও থাকার সুযোগ ছিল না; সেই দুঃসহ সময়ে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে শুরু করে হাসপাতালের নিঃসঙ্গ দিন-রাত কিংবা বিদেশযাত্রা—ছায়ার মতো খালেদা জিয়ার পাশে ছিলেন ফাতেমা। তার সেই নিষ্ঠা ও বিশ্বাসযোগ্যতার কথা ভুলে যাননি বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মায়ের প্রয়াণের পর এবার ফাতেমাকে নিযুক্ত করেছেন কন্যা জাইমা রহমানের সঙ্গী হিসেবে।

দুঃসময়েও ছিলেন খালেদা জিয়ার পাশে
ফাতেমা প্রথম আলোচনায় আসেন ২০১৪ সালের উত্তাল সময়ে। খালেদা জিয়ার ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচি ঠেকাতে তার গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’র সামনে বালুভর্তি ট্রাক রেখে রাস্তা অবরুদ্ধ করে রাখে তৎকালীন সরকার। বাসার সামনে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছিলেন খালেদা জিয়া। কিন্তু পুলিশের চাপে ঠিকভাবে দাঁড়াতেও পারছিলেন না। সেই উত্তপ্ত ঘটনাস্থলে নীরবে শক্ত করে খালেদা জিয়ার হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন ফাতেমা। নেত্রীকে নিরাপদ রাখার যে একাগ্রতা ফুটেছিল তার চোখে-মুখে তা ধরা পড়েছিল সাংবাদিকের ক্যামেরার ফ্রেমে। সেই সূত্রেই ফাতেমা পরিচিত হয়ে ওঠেন।

 

২০১৪ সালের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচিতে খালেদা জিয়ার হাতে ধরে আছেন ফাতেমা।

২০১৪ সালের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচিতে খালেদা জিয়ার হাতে ধরে আছেন ফাতেমা।

 

অবশ্য এর আগে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের প্রতিবাদে আন্দোলনের সময় গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল খালেদা জিয়াকে। পতাকা হাতে সে সময়ও পাশে ছিলেন ফাতেমা। ২০১৫ সালের শুরুতে টানা ৯২ দিন গুলশান কার্যালয়ে অবস্থান করেন খালেদা জিয়া। ফাতেমা পাশে ছিলেন পুরোটা সময়।

এর আরও কয়েক বছর আগে থেকেই খালেদা জিয়ার নির্ভরতার মানুষ হয়ে ওঠেন ফাতেমা। খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছেন এমন কয়েকজন জানান, ২০১০ সালে ফিরোজায় কাজে আনা হয় ফাতেমাকে। পূর্বপরিচিত খালেদা জিয়াকে ওষুধ খাওয়ানো, বিভিন্ন কিছু মনে করে দেওয়া, সার্বক্ষণিক পাশে থাকা—মূলত এসবই ছিল তার দায়িত্ব। কিন্তু গৃহপরিচারিকা হিসেবে কাজে যোগ দিলেও অল্প সময়ের মধ্যে খালেদা জিয়ার অনেক বেশি আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন তিনি।

সেই আস্থার প্রতিদান পরবর্তী সময়ে বারবার দিয়েছেন ফাতেমা। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানো হয়। আদালতের অনুমতি নিয়ে এর ছয় দিন পর নাজিমুদ্দিন রোডের পুরোনো সেই কারাগারে প্রবেশ করেন ফাতেমা। দর্শনার্থী হিসেবে নয়, সার্বক্ষণিক অবস্থানের জন্য! এভাবে স্বেচ্ছায় কারাবন্দি হওয়ার খুব বেশি নজির হয়তো নেই। প্রায় ২৫ মাস খালেদা জিয়ার সঙ্গে কারাগারে থেকেছেন ফাতেমা। এ ঘটনায় সেই সময় ফাতেমার নাম ধরে তাকে কটাক্ষ করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা!

২০২১ সালে করোনা আক্রান্ত হয়ে ৫৩ দিন হাসপাতালে ছিলেন খালেদা জিয়া। করোনার ভয়ে যখন প্রিয়জনকেও পাশে পাচ্ছে না মানুষ। সেই সময়েও খালেদা জিয়ার পাশে অবিচল ছিলেন ফাতেমা। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়া লন্ডনে যাওয়ার সময়ও সঙ্গে নেন ফাতেমাকে। কেবল জীবদ্দশায় নয়, বিদায়বেলাতেও খালেদা জিয়ার পাশেই ছিলেন ফাতেমা। অঝোর কান্না চোখে নিয়েও দাফনের সব প্রস্তুতিতে সহায়তা করেছেন। কফিনের পাশে হেঁটে কবর পর্যন্ত গেছেন তিনি।

 

সঙ্গী এখন জাইমা রহমানের
বিএনপি চেয়ারম্যানের গুলশান কার্যালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ম্যাডামের গৃহকর্মী ফাতেমার ত্যাগ ও অবদানের কথা সারা দেশের মানুষ জানে। ম্যাডামের মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও ফাতেমার অবদান ভুলে যাননি।

ভুলে না যাওয়ার প্রমাণ মিলেছে ফাতেমা বেগমের নতুন ভূমিকায়। বছরের পর বছর খালেদা জিয়ার হাত ধরে রেখেছিলেন যে ফাতেমা, তিনিই এখন আগলে রাখছেন খালেদা জিয়ান নাতনি ও তারেক রহমানের কন্যা জাইমাকে। জাইমার সার্বক্ষণিক সঙ্গী হিসেবে সব জায়গায় দেখা যাচ্ছে ফাতেমার উপস্থিতি। জাইমা যেখানে যাচ্ছেন, ফাতেমাও সেখানে সঙ্গ দিচ্ছেন—যেমনটি তিনি করতেন খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে।

কারাগারে যাওয়ার আগে বেগম খালেদা জিয়া প্রতি বছর প্রথম রমজানে এতিমদের সঙ্গে ইফতার করতেন। এ বছর রমজানে খালেদা জিয়া নেই, কিন্তু তার সেই রেওয়াজ ধরে রেখেছেন পুত্রবধূ ডা. জুবাইদা রহমান ও নাতনি জাইমা। এবার প্রথম রমজানে রাজধানীর ভাসানটেকে এতিমদের সঙ্গে ইফতারে অংশ নেন তারা। সেখানেও জুবাইদা ও জাইমার পাশে উপস্থিত ছিলেন ফাতেমা।

 

ফাতেমার পাশে একসঙ্গে ইফতারি করেন জাইমা রহমান।

এসব নিয়ে ফাতেমার কোনো বক্তব্য পাওয়া না গেলেও গুলশান কার্যালয় ঘনিষ্ঠ একাধিক ব্যক্তি জানান, প্রিয় নেত্রীকে হারিয়ে ফাতেমা শারীরিকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও মানসিকভাবে গভীর শোকে আচ্ছন্ন। তবে নতুন দায়িত্বে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন।

 

ফাতেমার সংগ্রামী জীবনের গল্প
ফাতেমার জন্ম ভোলা সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের শাহ মাদার গ্রামে। রফিকুল ইসলাম ও মালেকা বেগম দম্পতির পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি সবার বড়। একই ইউনিয়নের কৃষক হারুন লাহারির সঙ্গে বিয়ে হয় তার। এ দম্পতির দুই সন্তান মেয়ে জাকিয়া ইসলাম রিয়া ও ছেলে মোহাম্মদ রিফাত।

২০০৮ সালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে স্বামীর মৃত্যুতে দুই সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন ফাতেমা। বাবার সামান্য আয়ে সংসার চলছিল কষ্টে। শেষ পর্যন্ত সন্তানদের গ্রামে রেখে কাজের সন্ধানে ঢাকায় পাড়ি জমান তিনি। সেখান থেকেই শুরু হয় তার নতুন জীবন, যা একসময় তাকে দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের আস্থাভাজন করে তোলে। ফাতেমার জীবন যেন ত্যাগ, বিশ্বস্ততা ও নীরব দায়িত্ববোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

শেয়ার করুন:
লিঙ্ক কপি হয়েছে
Loading
আরও নিউজ লোড হচ্ছে...