বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬
Logo
×

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা:বাস্তবতা কী?

আনারুল ইসলাম ০৩ মার্চ ২০২৬, ১২:২৭ পূর্বাহ্ন

বিশ্ব রাজনীতি আবারও অস্থির এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে। ইউরোপে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের বিস্তার, ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা, লোহিত সাগরে নৌ-সংকট—সব মিলিয়ে বহুমাত্রিক সংঘাতের এক নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। পরাশক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সামরিক জোটের পুনর্গঠন এবং প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের বিস্তার আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—ভূ-রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত?

আধুনিক যুদ্ধ আর কেবল সীমান্তে ট্যাংক বা আকাশে যুদ্ধবিমানের সংঘর্ষ নয়। এখন ড্রোন, সাইবার আক্রমণ, স্যাটেলাইট নজরদারি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং তথ্যযুদ্ধ—সবই সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্রেন যুদ্ধ দেখিয়েছে, স্বল্প ব্যয়ে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাও শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে পারে। একই সঙ্গে সাইবার হামলা বিদ্যুৎ, ব্যাংকিং ও যোগাযোগব্যবস্থাকে অচল করে দিতে পারে মুহূর্তেই।

বাংলাদেশের জন্য এ বাস্তবতা তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সামরিক সক্ষমতা এখন কেবল সেনা সংখ্যার ওপর নির্ভরশীল নয়; নির্ভর করছে প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও কৌশলগত প্রস্তুতির ওপর।

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনী তিনটি শাখা—সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী—নিয়ে গঠিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর আওতায় আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নৌবাহিনীতে সাবমেরিন যুক্ত হয়েছে, বিমানবাহিনীতে আধুনিক যুদ্ধবিমান ও রাডার সিস্টেম সংযোজন হয়েছে, সেনাবাহিনীতে সাঁজোয়া যান ও আর্টিলারি শক্তিশালী করা হয়েছে।

তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাজেট জিডিপির তুলনায় এখনো সীমিত। আঞ্চলিক শক্তি ভারত ও মিয়ানমারের তুলনায় সামরিক ব্যয় অনেক কম। উচ্চপ্রযুক্তি নির্ভর অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আত্মনির্ভরতার ক্ষেত্রেও অগ্রগতি ধীর।

বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত উপকূলে অবস্থিত। ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ, ভারতের আঞ্চলিক প্রভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক উপস্থিতি—সবকিছুর সংযোগস্থলে রয়েছে দেশটি। ফলে বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সরাসরি জড়ানোর ঝুঁকি না থাকলেও পরোক্ষ চাপের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

অন্যদিকে, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সাফল্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছে। এটি কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক।

বিশ্বের সংঘাতগুলো দেখাচ্ছে—সাইবার নিরাপত্তা এখন জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ব্যাংকিং, বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ ও সরকারি ডেটাবেইস সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে যুদ্ধ ছাড়াই বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। বাংলাদেশে ডিজিটাল অবকাঠামো দ্রুত বিস্তৃত হলেও সাইবার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এখনো উন্নয়নের পথে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকট ও সীমান্ত নিরাপত্তা—এসব বিষয়ও প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

তাহলে করণীয়-

প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়ন: ড্রোন প্রতিরক্ষা, সাইবার কমান্ড ও স্যাটেলাইট নজরদারি সক্ষমতা বাড়ানো।
প্রতিরক্ষা শিল্পে আত্মনির্ভরতা: ক্ষুদ্র অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের বিস্তার।
কূটনৈতিক ভারসাম্য: পরাশক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিরপেক্ষ অবস্থান শক্তিশালী করা।
সমন্বিত নিরাপত্তা কৌশল: সামরিক, অর্থনৈতিক ও সাইবার নিরাপত্তাকে একত্রে বিবেচনা করা।

বাংলাদেশ সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে না থাকলেও বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নয়। আধুনিক যুদ্ধের প্রকৃতি বদলে যাওয়ায় প্রতিরক্ষা সক্ষমতাও নতুনভাবে ভাবতে হবে। সীমিত সম্পদের মধ্যেও কৌশলগত পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল ও আত্মবিশ্বাসী নিরাপত্তা কাঠামো নির্মাণ করতে সক্ষম হবে।

বিশ্ব যখন অনিশ্চয়তার পথে, তখনই সময় ভবিষ্যৎকে সামনে রেখে প্রস্তুতি নেওয়ার।

শেয়ার করুন:
লিঙ্ক কপি হয়েছে
Loading
আরও নিউজ লোড হচ্ছে...