বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬
Logo
×
নরসুন্দর

মাটিতে বসে চুল-দাঁড়ি কামানো: হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ নরসুন্দরের ঐতিহ্য

প্রথম সমাচার ডেস্ক ০৩ মার্চ ২০২৬, ০৭:২২ অপরাহ্ন

নেত্রকোনা সদর উপজেলার চল্লিশা বাজারের এক বিকেলের দৃশ্য—রাস্তার ধারে মাটিতে পাটি পেতে বসেছেন এক নরসুন্দর। সামনে ক্ষুর, কাঁচি, চিরুনি আর একটি ছোট আয়না। গ্রাহকও বসেছেন নিচু টুলে, কাঁধে জড়ানো গোলাপি কাপড়। আধুনিক সেলুন সংস্কৃতির বাইরে গ্রামবাংলার বহু পুরোনো এক পেশার বাস্তব ছবি এটি। ছবিটি তুলেছেন স্থানীয় তরুণ আনারুল, যিনি মনে করেন—“আধুনিকতার ভিড়ে নরসুন্দরের ঐতিহ্য দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে।”

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে নরসুন্দর বা হাজাম পেশা দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক কাঠামোর অংশ। বিয়ে, খৎনা, অন্নপ্রাশন কিংবা ধর্মীয় নানা আচার—সবখানেই তাদের উপস্থিতি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। একসময় গ্রামের নির্দিষ্ট পরিবারগুলোই প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এ পেশায় যুক্ত থাকত। পারিশ্রমিক হিসেবে শুধু নগদ টাকা নয়, ধান-চাল বা ফসলের অংশও পেতেন তারা—যাকে গ্রামীণ অর্থনীতির বিনিময়ভিত্তিক (barter) ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখা হয়।

স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, সাপ্তাহিক হাটের দিন ছিল নরসুন্দরের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। হাটের পাশে বা গাছতলায় বসেই চলত চুল কাটা, দাড়ি কামানো। গ্রাহকেরা নিজেদের চাদর বা গামছা সঙ্গে আনতেন। এই প্রক্রিয়া ছিল কম খরচের, সহজলভ্য এবং সামাজিক মেলবন্ধনের একটি ক্ষেত্র।

গত দুই দশকে গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে আধুনিক সেলুন সংস্কৃতি। কাঁচের ঘর, ঘূর্ণায়মান চেয়ার, বৈদ্যুতিক ট্রিমার, ফেসওয়াশ, হেয়ার জেল—সব মিলিয়ে চুল কাটাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা। ফলে খোলা আকাশের নিচে বা রাস্তার ধারে মাটিতে বসে কাজ করা নরসুন্দরের সংখ্যা দ্রুত কমেছে।

নেত্রকোনা অঞ্চলের কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, আধুনিক সেলুনে একবার চুল কাটার খরচ যেখানে ৬০–১৫০ টাকা, সেখানে রাস্তার ধারের নরসুন্দর নেন ৩০–৫০ টাকা। তবুও তরুণ প্রজন্ম বেশি আগ্রহী আধুনিক সেবায়। কারণ হিসেবে তারা স্বাস্থ্যবিধি, আরামদায়ক পরিবেশ ও নতুন স্টাইলের চাহিদার কথা উল্লেখ করেন।

গবেষকরা বলছেন, নরসুন্দর পেশাটি ঐতিহাসিকভাবে পেশাভিত্তিক সামাজিক বিন্যাসের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে শিক্ষা বিস্তার, নগরায়ণ ও পেশাগত বহুমুখীকরণের ফলে এ পেশায় নতুন প্রজন্মের আগ্রহ কমছে। অনেক পরিবার বিকল্প আয়ের পথ বেছে নিচ্ছে—কেউ বিদেশে শ্রমবাজারে যাচ্ছেন, কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছেন।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এটি কেবল একটি পেশার পরিবর্তন নয়; বরং গ্রামীণ সংস্কৃতির একটি ধারার রূপান্তর। আগে নরসুন্দরের সঙ্গে গ্রাহকের সম্পর্ক ছিল দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যক্তিগত। এখন তা হয়ে উঠেছে সেবা-গ্রাহক ভিত্তিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খোলা পরিবেশে ক্ষুর ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, যদি সঠিকভাবে জীবাণুমুক্ত না করা হয়। আধুনিক সেলুনগুলোতে একবার ব্যবহারযোগ্য ব্লেড ও স্যানিটাইজার ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। তবে বাস্তবে গ্রামাঞ্চলের অনেক সেলুনেও স্বাস্থ্যবিধি মানা হয় না—ফলে ঝুঁকি উভয় ক্ষেত্রেই থেকে যায়।

এক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সচেতনতা কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে মত দেন তারা।

ছবিটি তোলা তরুণ আনারুল বলেন, “আমরা ছোটবেলায় চাল দিয়ে, কখনো টাকা দিয়ে মাটিতে বসে চুল কাটাতাম। এখন সেই দৃশ্য আর দেখা যায় না।” তার মতে, এই পরিবর্তন উন্নয়নেরই অংশ, তবে ঐতিহ্যের নথিবদ্ধকরণ জরুরি।

সংস্কৃতিবিদদের মতে, গ্রামীণ নরসুন্দরের এই চর্চা অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। লোকজ পেশা, হাটসংস্কৃতি ও বিনিময় অর্থনীতি—সবকিছু মিলিয়ে এটি বাংলাদেশের সামাজিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সম্পূর্ণ বিলুপ্ত না হলেও এই পেশা ধীরে ধীরে রূপ বদলাবে। কেউ আধুনিক সেলুনে রূপান্তরিত হবেন, কেউ বিশেষ অনুষ্ঠানভিত্তিক সেবায় যুক্ত থাকবেন। তবে রাস্তার ধারে পাটি পেতে বসা নরসুন্দরের দৃশ্য হয়তো ভবিষ্যতে কেবল ছবিতেই দেখা যাবে।

গ্রামীণ জীবনের পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় এ দৃশ্য একদিকে নস্টালজিয়া, অন্যদিকে সামাজিক-অর্থনৈতিক রূপান্তরের স্পষ্ট চিত্র—যা উন্নয়ন, সংস্কৃতি ও জীবিকার আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

শেয়ার করুন:
লিঙ্ক কপি হয়েছে
Loading
আরও নিউজ লোড হচ্ছে...