মানবজীবনে ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। যার মুখে ভাষা নেই, সেই শুধু বুঝতে পারে ভাষার কি মূল্য! ভাষা যে শুধুমাত্র মনের ভাব প্রকাশ করে এমনটা নয়, বরং ভাষাই মানুষকে প্রকৃত ‘মানুষ’ করে তোলে। একজন মানুষকে সভ্য, সামাজিক ও উন্নতকরণে ভাষার ভূমিকা অনেক।
ভাষা মহান আল্লাহর এক অনন্য দান। আল্লাহ মানুষকে ভাষা শিখিয়েছেন। তিনিই মানুষের ভাষার শিক্ষক। কোরআনে আছে, ‘(তিনি আল্লাহ) সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তাকে শিখিয়েছেন ভাষা।’ ( সুরা রহমান, আয়াত: ৩-৪)। কোরআনের আরেক জায়গা আছে, ‘আল্লাহ তাআলা শেখালেন আদমকে সমস্ত বস্তুর নাম।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ৩১)
পৃথিবীতে অনেক ভাষা আছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘সামার ইনস্টিটিউট অব লিঙ্গুয়িস্টিকের (এসআইএল) অধীনে এথনোলগ দ্য ল্যাংগুয়েজেস অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামের ভাষাসংক্রান্ত একটি প্রকাশনার ১৯৯৯ সালের জরিপে বলা হয়েছে, ‘পৃথিবীতে জীবন্ত ভাষার সংখ্যাই আছে প্রায় ৬ হাজারের অধিক।’ ( সূত্র: ইন্টারনেট )। মজার ব্যাপার হলো, পৃথিবীতে এই যে অসংখ্য ভাষা, এই অসংখ্য ভাষার উচ্চারণগত ভিন্নতাও কিন্তু অসংখ্য রকমের।
রবীন্দ্রনাথ আশ্চর্য হয়ে বলেছিলেন, ‘ভাষার আশ্চর্য রহস্য চিন্তা করে বিস্মিত হয়।’ ভাষার এই বৈচিত্র্যময় রহস্য দেখে আশ্চর্য হওয়া হয়তো স্বাভাবিক। তবে কথা হলো, ভাষার এই বৈচিত্র্যতা, মানুষকে শুধু আশ্চর্যই করে তা কিন্তু নয়। বৈচিত্র্যময় এই ভাষা মানুষের জ্ঞানভাণ্ডারকে করে সমৃদ্ধি ও গতিশীল। আল্লাহ বলেন, ‘তাঁর আরও এক নিদর্শন হচ্ছে ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্যতা। নিশ্চয় এতে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা রুম, আয়াত: ২২)
ভাষার বৈচিত্র্য যেভাবে হলো
নৃবিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর প্রথম মানববসতি গড়ে উঠেছিল শ্রীলঙ্কার ‘এড্যামস পিক’ নামক পর্বতে। পরে সেখান থেকে মানবজাতি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনধারাই যেমন পরিবর্তন পরিবর্ধন এসেছে, ঠিক তেমনি পালাবদল হয়েছে তাদের ভাষায়ও।
সবার আগে মাতৃভাষা
পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের কাছে তার মাতৃভাষার গুরুত্বই সবচেয়ে বেশি। ইসলামও মাতৃভাষাকে স্মরণ করে অপরিসীম গুরত্বের সঙ্গে। মাতৃভাষা শিক্ষা ও বিকাশে ইসলামের রয়েছে অকুণ্ঠ সমর্থন। মাতৃভাষার প্রতি রাসুল (সা.)-এর ভালোবাসা ছিল অপরিসীম। মাতৃভাষা আল্লাহপ্রদত্ত পবিত্র এক নেয়ামত। আল্লাহ বলেন, ‘আমি সব নবীকে তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি। যেন তাদের (জাতির লোকদের) পরিষ্কার বুঝাতে পারেন।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ৪)
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ গোত্রের ভাষায় কথা বলতেন। সাহাবিদেরও মানুষের বোধগম্য ভাষায় দাওয়াত দিতে উৎসাহিত করতেন।
বাংলা ভাষায় মুসলমানদের অবদান
বাংলা আমাদের মায়ের ভাষা। বাংলা আমাদের প্রাণের ভাষা। আমরা এ ভাষায় কথা বলি, এ ভাষাতেই হাসি-কাঁদি। প্রকাশ করি উচ্ছ্বাস। অনেকেই না জেনে বলেন, আগেকার মুসলমানরা বাংলাভাষাকে অগ্রাহ্য করতেন। কিন্তু সত্য হলো, আমাদের দেশে ইসলাম প্রচার করতে আসা মুসলিমরা গ্রামগঞ্জের ভাষা আয়ত্ব করেই ইসলামের প্রচার করেছেন। বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরতে তারা বাংলা ভাষাকেই বেছে নিয়েছেন। দ্বীনেশচন্দ্র সেন তার ‘বঙ্গভাষার ওপর মুসলমানদের প্রভাব’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘মুসলমান আগমনের পূর্বে বঙ্গভাষা কোনো কৃষক রমণীর ন্যায় দীন হীন বেশে পল্লী কুটিরে বাস করিতে ছিল।…ইতরের ভাষা বলিয়া বঙ্গভাষাকে পণ্ডিত মণ্ডলী দূর দূর করিয়া তাড়াইয়া দিতেন। কিন্তু হীরা যেমন কয়লার খনির মধ্যে থাকিয়া জহুরীর আগমনের প্রতীক্ষা করে, বঙ্গভাষা তেমনিই কোনো শুভ দিন, শুভ ক্ষণের জন্য প্রতীক্ষা করিতে ছিল। মুসলমান বাঙ্গালা ভাষায় সেই শুভ দিন, শুভ ক্ষণের সুযোগ আনয়ন করিল।’ (লেখকের বানান হুবহু রাখা হয়েছে) ওপরের উদ্ধৃতি থেকে এ কথাই স্পষ্ট হয়, মুসলমানরাই বাংলা ভাষাকে স্বমহিমায় সমুন্নত করেছেন।
মাতৃভাষা বাংলা আমাদের কাছে আল্লাহর আমানত। আমাদের পূর্বপুরুষরা সেই আমানত রক্ষায় জীবন দিয়েছেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রয়ারি ভাষা রক্ষার আন্দোলনে শহিদ হয়েছেন সালাম, রফিক, জব্বর, বরকত, শফিউরসহ অনেকে। তাদের প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা ও বুকভরা ভালোবাসা। আল্লাহ তাদের জান্নাত দান করুন।
