বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬
Logo
×
বিসিএস ক্যাডার

মেধা-অধ্যবসায় ও পরিশ্রমে বিসিএস ক্যাডার আরাফাত শাহীন:জানাচ্ছেন অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ

প্রথম সমাচার ডেস্ক ১১ মার্চ ২০২৬, ১০:০২ অপরাহ্ন

গ্রামের প্রতিকূল পরিবেশ থেকে উঠে এসে ৪৫তম বিসিএসে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তরুণ লেখক ও সরকারি কর্মকর্তা আরাফাত শাহীন। অধ্যবসায়, ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাসের গল্প শুনিয়েছেন তিনি।

আরাফাত শাহীন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। শিক্ষাজীবনের বড় একটি সময় কেটেছে গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। তিনি ফুলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নহাটা রাণী পতিত পাবনী মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও নহাটা আইডিয়াল কলেজ থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। গ্রামের মুক্ত পরিবেশ যেমন তাকে প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার সুযোগ দিয়েছে, তেমনি পড়াশোনার পথে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখিও হতে হয়েছে। তবে সব বাধা অতিক্রম করেই তিনি আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন।

নিম্নবিত্ত কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া আরাফাত শাহীন নয় ভাই–বোনের মধ্যে সবার ছোট। তার বাবা একজন বর্গাচাষী। পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও সন্তানদের শিক্ষার বিষয়ে বাবা সবসময় আন্তরিক ছিলেন। বড় বোনদের অনেকেই পড়াশোনা সম্পন্ন করেছেন এবং দু’জন সরকারি চাকরিতেও নিয়োজিত আছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আরাফাত শাহীন পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা তাকে জীবনের বাস্তবতা সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। একই সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির প্রতি তার আগ্রহ ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে সেই আগ্রহ আরও বিস্তৃত হয়। জাতীয় বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত গল্প, কবিতা, ফিচার ও কলাম লিখতেন তিনি। ছাত্রজীবন শেষ হওয়ার আগেই তার তিনটি বই প্রকাশিত হয়, যার ফলে বন্ধু মহলে তিনি ‘কবি’ হিসেবেও পরিচিতি পান।

তবে এক সময় বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে জীবনের নতুন সিদ্ধান্ত নিতে হয় তাকে। মাস্টার্স পরীক্ষার পর রাজশাহীতে অবস্থানকালে একদিন সংগঠনের সহকর্মীদের সঙ্গে অটোরিকশায় ফেরার সময় ভাড়া দেওয়ার পর হাতে থাকা টাকার হিসাব তাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে। সেদিনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন জীবনে কিছু করতে হবে। পরদিনই রাজশাহী ছেড়ে নতুন সংগ্রামের পথে যাত্রা শুরু করেন।

প্রথমে কয়েক মাস খুলনায় অবস্থান করার পর তিনি সাভারের নবীনগরে আত্মীয়ের কাছে চলে আসেন। এরপর ঢাকায় থেকেই বিসিএস পরীক্ষার জন্য নিয়মিত প্রস্তুতি শুরু করেন। প্রয়োজনীয় বই সংগ্রহ করে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যান। তবে শুরুটা সহজ ছিল না। টানা তিনটি বিসিএস—৪১তম, ৪৩তম ও ৪৪তম—প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হতে পারেননি। তবুও তিনি হাল ছাড়েননি।

অবশেষে ৪৫তম বিসিএসে এসে প্রথমবারের মতো প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর ধাপে ধাপে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় সফল হয়ে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। এর আগে তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সহকারী কাস্টোডিয়ান হিসেবে খুলনার দক্ষিণডিহিতে অবস্থিত রবীন্দ্র স্মৃতি জাদুঘরে কর্মরত আছেন।

আরাফাত শাহীন মনে করেন, বিসিএস বা যেকোনো সরকারি চাকরির জন্য সময়ানুবর্তিতা ও একাগ্রতার কোনো বিকল্প নেই। তার ভাষায়, বিসিএস একটি দীর্ঘ যাত্রা। এই যাত্রায় ধৈর্য হারালে চলবে না। ২০২২ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত ৪৫তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তির চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত হয়েছে প্রায় তিন বছর পর। এত দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুতি চালিয়ে যাওয়া শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক—সব দিক থেকেই চ্যালেঞ্জিং।

তিনি বলেন, বিসিএসে সফল হতে শুধু পরিশ্রমই নয়, ভাগ্যের সহায়তাও প্রয়োজন হয়। অনেক মেধাবী ও পরিশ্রমী প্রার্থীও শেষ পর্যন্ত সফল হতে পারেন না। তাই হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধরে এগিয়ে যেতে হবে। তার এই দীর্ঘ যাত্রায় পরিবার, বন্ধু ও বড় ভাইবোনদের উৎসাহ তাকে সাহস জুগিয়েছে।

সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়ে দেশের মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে চান আরাফাত শাহীন। তিনি বলেন, যে গ্রামীণ পরিবেশ থেকে তিনি উঠে এসেছেন, সেই এলাকার মানুষের উন্নয়ন ও শিক্ষার প্রসারে কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে তার।

বিসিএস প্রত্যাশীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, লক্ষ্য অর্জনে একাগ্রতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যের কথায় নিরুৎসাহিত হওয়া যাবে না। সময়ের সঠিক ব্যবহার করতে হবে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে। নিয়মিত পত্রিকা পড়া, সমাজ–অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে প্রবন্ধ অধ্যয়ন এবং চিন্তাশক্তির উন্নয়ন লিখিত পরীক্ষায় ভালো করতে সহায়ক বলে মনে করেন তিনি।

তার বিশ্বাস—অধ্যবসায়, ধৈর্য ও সঠিক প্রস্তুতি থাকলে পরিশ্রম কখনও বিফলে যায় না।

শেয়ার করুন:
লিঙ্ক কপি হয়েছে
Loading
আরও নিউজ লোড হচ্ছে...