বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬
Logo
×

লোকসংস্কৃতি থেকে ভাইরাল ট্রেন্ড: ‘দোহাই ল্যাংটা’ গানকে ঘিরে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পাঠ

কাজী জহিরুল ইসলাম ১৭ মার্চ ২০২৬, ১০:২৪ পূর্বাহ্ন

বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটক-এ সাম্প্রতিক সময়ে “দোহাই ল্যাংটা” গানটির খণ্ডিত অংশের ব্যাপক প্রচলন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ল্যাংটা বাবা শাহ সোলায়মান মাজারকেন্দ্রিক এই ভক্তিমূলক লোকগানটি এখন ফেসবুক রিল, শর্ট ভিডিও, মিম এবং নানা বিনোদনমূলক কনটেন্টে তরুণদের মধ্যে বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। তবে এই ভাইরাল ট্রেন্ডের পেছনে রয়েছে গভীর গ্রামীণ লোকবিশ্বাস, মাজারকেন্দ্রিক সুফি ঐতিহ্য এবং বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট।

গানটির মূল উৎস বাংলাদেশের চাঁদপুর অঞ্চলে। সেখানকার সুফি ঘরানার ধর্মীয় সাধক শাহ সোলায়মান ল্যাংটা (যিনি “ল্যাংটা বাবা” নামে পরিচিত) কে কেন্দ্র করেই এ গানের উৎপত্তি ও প্রচলন। তাঁকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে নানান লোককথা, কিংবদন্তি এবং ভক্তিমূলক গান প্রচলিত রয়েছে। “বেলতুলি সোলায়মান ল্যাংটা, দোহাই ল্যাংটা” এই গানটি সেই ধারারই একটি অংশ, যেখানে সাধকের আধ্যাত্মিকতা, কর্মকাণ্ড এবং পীর-দরবেশদের স্মৃতি স্থানিক নামের সঙ্গে মিশে এক ধরনের ভক্তিমূলক আখ্যান তৈরি করেছে।

এই গানের সঙ্গে যুক্ত বিশ্বাস, সংস্কার ও মূল্যবোধ শুধু স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা সমগ্র বাংলাদেশের মাজারকেন্দ্রিক সংস্কৃতির প্রতিফলন। বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজ থেকে শুরু করে শহুরে সমাজেও বিভিন্ন পীর বা দরবেশকে ঘিরে মাজারকেন্দ্রিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। যেমন শাহ জালাল, শাহ পরান সহ অনেক পীর জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত সাধক হলেও আরও অনেক পীর আছেন যারা স্থানীয়ভাবে ভক্তদের কাছে অত্যন্ত সম্মানিত। তাঁদের ঘিরে প্রতিবছর ওরস, মেলা এবং বিভিন্ন ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।

এসব অনুষ্ঠানে লোকশিল্পীরা ভক্তিমূলক গান পরিবেশন করেন। যেখানে পীরের দরবারে প্রার্থনা, আশ্রয় প্রার্থনা এবং ব্যক্তিগত কামনা-বাসনা প্রকাশ পায়। ভক্তদের বিশ্বাস অনুযায়ী, এসব সাধক স্রষ্টার নিকট পৌঁছানোর একটি মাধ্যম। “দোহাই” শব্দটি বাংলার লোকভাষায় প্রার্থনা বা আশ্রয় প্রার্থনার প্রতীক। আর এ প্রার্থণা বা আশ্রয়ের মাধ্যমে সাধকের প্রতি আধ্যাত্মিক আবেদন জানানো হয়।

“বেলতুলি” শব্দটি এখানে একটি স্থানিক ইঙ্গিত বহন করে, যা সম্ভবত ল্যাংটা বাবার বসবাস বা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত কোনো স্থানকে নির্দেশ করে। একইভাবে “ল্যাংটা” পরিচিতিটি আধুনিক তরুণদের কাছে হাস্যরসের উপাদান হলেও ল্যাংটা বাবার ভক্তদের কাছে এটি একধরনের আধ্যাত্মিক পরিচয়। যার মধ্যে তাঁর ত্যাগ, সাধনা ও দার্শনিক অবস্থান প্রতিফলিত হয়েছে।একটি সঙ্গীতকে নকল করে করা লোকসঙ্গীতের অন্য একটি গানের লাইন “আসবার কালে আসলাম ল্যাংটা, যাবার কালে যাবো ল্যাংটা”এই দর্শনেরই প্রতিফলন দেখা যায়। যেখানে মানবজীবনের অনিত্যতা ও বৈরাগ্যের ধারণা প্রকাশ পায়।

ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত

তবে ডিজিটাল যুগে এই অর্থ অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণরা “ল্যাংটা” শব্দটিকে অনেক ক্ষেত্রে হাস্যরসাত্মকভাবে ব্যবহার করছে, যা গানের মূল আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে একটি বৈপরীত্য তৈরি করছে। ফলে একই সাংস্কৃতিক উপাদান ভিন্ন প্রজন্মে, ভিন্ন স্থানে ও ভিন্ন পরিবেশে ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। যেটি মূল অর্থ থেকে পুরোপুরি বিপরীতধর্মী অর্থকে ইঙ্গিত করছে।

ফোকলোর বা লোকসংস্কৃতির দৃষ্টিতে এই গানটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। লোকসংগীত, বিশেষ করে ভক্তিমূলক গানগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো: এগুলোর নির্দিষ্ট রচয়িতা বা সময়কাল অনেক সময় অজানা থাকে, এবং এগুলো মৌখিকভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে। আঞ্চলিক ভাষা, হাস্যরস, ধর্মীয় অনুভূতি এবং লোকবিশ্বাসের সমন্বয়ে এসব গান একটি সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব লোকগান তাদের মূল ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে বৃহত্তর সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। “দোহাই ল্যাংটা” গানটিও চাঁদপুরের স্থানীয় পরিসর ছাড়িয়ে এখন সারাদেশের তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এর একটি বড় কারণ হলো ডিজিটাল মিডিয়ার বিস্তার।

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছোট ভিডিও বা রিল তৈরির জন্য ব্যবহারকারীরা এমন শব্দ বা লাইন খোঁজেন যা ছন্দময়, অদ্ভুত এবং সহজে মনে রাখার মতো। “দোহাই ল্যাংটা” ঠিক সেই ধরনের একটি লাইন হওয়ায় এটি দ্রুত ভাইরাল হয়েছে। এখন এটি মিম, ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও কিংবা নাচের ক্লিপে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা একটি লোকগানকে আধুনিক ডিজিটাল সংস্কৃতির প্রভাবে জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশে পরিণত করেছে।

এই প্রক্রিয়াটি সাংস্কৃতিক রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। লোকসংস্কৃতির উপাদানগুলো যখন আধুনিক মিডিয়ায় প্রবেশ করে, তখন সেগুলো নতুন অর্থ ও নতুন ব্যবহারিক রূপ লাভ করে। ফলে ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতির মধ্যে একটি নতুন সংযোগ তৈরি হয়।

একই সঙ্গে এটি গবেষণার নতুন ক্ষেত্রও তৈরি করছে। কীভাবে এসব লোকজ উপাদানকে সংরক্ষণ, পুনর্ব্যাখ্যা এবং এমনকি বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে বৃহত্তর পরিসরে উপস্থাপন করা যায়- তা নিয়ে ফোকলোরবিদ এবং সমাজবিজ্ঞানীরা এখন ভাবতে পারেন। যাতে একদিকে সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, অন্যদিকে তা নতুন প্রজন্মের কাছেও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠার মাধ্যমে টিকে থাকে।

সবশেষে বলা যায়, “দোহাই ল্যাংটা” লাইনটি আজকের তরুণদের কাছে হয়তো একটি ভাইরাল ট্রেন্ড বা বিনোদনের উপাদান। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের মাজারকেন্দ্রিক লোকবিশ্বাস ও ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দীর্ঘ ইতিহাস। ডিজিটাল যুগে এই ধরনের গান তাদের প্রেক্ষাপট বদলে নতুনভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে- যা একদিকে বিনোদন, অন্যদিকে লোকসংস্কৃতির ধারাবাহিকতার এক নতুন অধ্যায়।

শেয়ার করুন:
লিঙ্ক কপি হয়েছে
Loading
আরও নিউজ লোড হচ্ছে...