বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬
Logo
×
লোডশেডিং নাকি ঋণ

লোডশেডিং থেকে ঋণের বোঝা: বিদ্যুৎ খাতের কঠিন বাস্তবতা

প্রথম সমাচার ডেস্ক ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:৫৭ পূর্বাহ্ন

 

বিদ্যুৎ খাত নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ-এর সাম্প্রতিক মন্তব্য। তাঁর বক্তব্য—“আমরা লোডশেডিং রেখে গিয়েছিলাম সত্য, কিন্তু জাতির কাঁধে বোঝা রেখে যাইনি। এখন বাতি জ্বলে ঠিকই, কিন্তু জাতির কাঁধে বোঝা অনেক”—শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি দেশের বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘদিনের আর্থিক কাঠামোগত সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে।

সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে দেওয়া এ বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক তথ্য। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কাছে বিভিন্ন কোম্পানির পাওনা প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা, আর বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের পুঞ্জীভূত লোকসান প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা—সব মিলিয়ে প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকার আর্থিক চাপ। অর্থ উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর-এর সঙ্গে বৈঠকে এসব তথ্য উঠে আসে। প্রশ্ন হলো—কীভাবে এ পর্যায়ে পৌঁছাল বিদ্যুৎ খাত?

গত এক দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকার ঘনঘন লোডশেডিং কমাতে এবং শিল্পোৎপাদন সচল রাখতে দ্রুত চুক্তিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করে। কিন্তু উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি, সক্ষমতা চার্জ এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ধীরে ধীরে আর্থিক ভারসাম্য নষ্ট করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ফলাফল—উৎপাদন আছে, আলো জ্বলছে, কিন্তু আর্থিক ভিত্তি দুর্বল।

অতীতে লোডশেডিং ছিল দৃশ্যমান সংকট; জনগণ সরাসরি ভোগান্তি দেখেছে। কিন্তু বর্তমান সংকট অদৃশ্য—এটি হিসাবের খাতায়, ঋণের বোঝায়, বাজেট ঘাটতিতে। একদিকে ভর্তুকি কমাতে গেলে বিদ্যুতের দাম বাড়ে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায়। অন্যদিকে ভর্তুকি অব্যাহত রাখলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর চাপ বাড়ে। এই দ্বৈত চাপে নীতিনির্ধারকদের জন্য পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

খাতের সমস্যাকে শুধুমাত্র অতীত বা বর্তমান সরকারের দায়ে সীমাবদ্ধ করলে সমাধান আসবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার। বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির স্বচ্ছতা, সক্ষমতা চার্জ পুনর্বিবেচনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সিস্টেম লস কমানো এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে আর্থিক দায় পরিশোধে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা না থাকলে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

লোডশেডিং না থাকাটা অবশ্যই অর্জন। কিন্তু যদি সেই আলোর পেছনে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ঋণের ভার জমা হয়, তবে তা টেকসই উন্নয়ন নয়। বিদ্যুৎ খাতকে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে এনে আর্থিক ও নীতিগত বাস্তবতার আলোকে পুনর্গঠন করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

শেয়ার করুন:
লিঙ্ক কপি হয়েছে
Loading
আরও নিউজ লোড হচ্ছে...