বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬
Logo
×
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত

মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ‘চোখ’ অন্ধ করে দিল ইরান

প্রথম সমাচার ডেস্ক ০৯ মার্চ ২০২৬, ০৯:২১ অপরাহ্ন

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এখন আর কেবল বিমান হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে ইরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত এবং অত্যন্ত মূল্যবান সামরিক স্থাপনার উপর আঘাত হানছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জর্ডানে অবস্থিত একটি বিমান ঘাঁটিতে ইরানের নিখুঁত হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাডার ধ্বংস হওয়ার খবর বিশ্বজুড়ে সামরিক বিশ্লেষকদের চিন্তায় ফেলেছে। এটি সাধারণ কোনো রাডার নয়, বরং এটি ‘থাড’ নামক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

থাড ব্যবস্থা: কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি থাড ব্যবস্থাটি মূলত বায়ুমণ্ডলের সীমানায় থাকা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে চিহ্নিত ও ধ্বংস করার জন্য নকশা করা। এই ব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র হলো এর অত্যন্ত শক্তিশালী রাডার, যার মূল্য প্রায় ত্রিশ কোটি মার্কিন ডলার। সম্পূর্ণ একটি থাড ব্যাটারির মূল্য প্রায় একশ কোটি ডলার।

এই রাডারটি বহুদূর থেকে ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে এবং সেগুলোকে আকাশেই ধ্বংস করার জন্য প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুর দিকে পরিচালিত করে।

এটি এমন কোনো যন্ত্রাংশ নয় যা রাতারাতি বদলে ফেলা যায়। কৌশলগত ও আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্রের মতে, পুরো বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র আটটি থাড রাড়ার রয়েছে। ফলে এর ক্ষতিপূরণ অপূরণীয়।

থাড রাডারে সফল আঘাত ইরানের এযাবৎকালের সবচেয়ে সফল সামরিক পদক্ষেপগুলোর মধ্যে একটি। এটি একটি দুষ্প্রাপ্য কৌশলগত সম্পদ, এবং এর ধ্বংস হওয়াটা মার্কিন বাহিনীর জন্য বিশাল এক ধাক্কা। সামরিক বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে ব্লুমবার্গ সংবাদমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে।

এই রাডারটি ধ্বংস হওয়ার অর্থ হলো একটি নির্দিষ্ট এলাকায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর ‘চোখ’ অন্ধ হয়ে যাওয়া।

এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করে। এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব, পারমাণবিক স্থাপনা, নৌবাহিনী এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করা। প্রাথমিক হামলায় ইরানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও, ইরান প্রমাণ করেছে যে তারা পাল্টা আঘাত হানতে প্রস্তুত।

থাড রাডার ধ্বংস করার পাশাপাশি, কাতারে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি সতর্কতামূলক রাডারও ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ইরান সুপরিকল্পিতভাবে পারস্য উপসাগরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি ব্যবস্থা তথা ‘চোখ’গুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।

এই ঘটনা প্রমাণ করে, সংঘাত এখন আর একতরফা নেই। ইরান এমন সব লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে, যা কৌশলগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন তাদের অস্ত্র উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধি করার জন্য সমরাস্ত্র নির্মাতাদের সাথে জরুরি বৈঠক করছে, তবে এই শূন্যস্থান পূরণ করতে লাগবে দীর্ঘ সময়।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এক অপ্রত্যাশিত নতুন মোড় নিয়েছে। পূর্বনির্ধারিত সামরিক লক্ষ্যবস্তুর পরিকল্পনা বাতিল করে ইসরায়েল আচমকা ইরানের প্রায় ত্রিশটি জ্বালানি মজুতকেন্দ্রে ভয়াবহ হামলা চালিয়ে সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই আকস্মিক হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কোনো আগাম তথ্য ছিল না।

হামলা যখন চলমান, ঠিক তখনই ওয়াশিংটন বিষয়টি জানতে পারে। ইসরায়েলের এই পদক্ষেপে মার্কিন প্রশাসন চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।

সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার হলো বর্তমান সংঘাতের সময়কাল। এই তীব্র উত্তেজনার মাত্র দশ দিন পার হয়েছে, আর এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মধ্যে কৌশলগত ও সিদ্ধান্তগত বড় ধরনের মতবিরোধ প্রকাশ্যে চলে এসেছে।

অন্যদিকে, ইরান কোনো ধরনের আবেগপ্রবণ বা তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না। তারা অত্যন্ত শান্তভাবে পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে, মিত্রদের মধ্যকার ফাটলগুলো হিসাব-নিকাশ করছে এবং অত্যন্ত সুকৌশলে নিজেদের পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য ছক কষছে।

শেয়ার করুন:
লিঙ্ক কপি হয়েছে
Loading
আরও নিউজ লোড হচ্ছে...