বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬
Logo
×

ভূমধ্যসাগরের নীল জলে এক রূপকথা: তুরস্কের কিজ কালেসি ভ্রমণ

লেখক: কাজী জহিরুল ইসলাম ১৮ মার্চ ২০২৬, ১০:০৭ পূর্বাহ্ন

তুরস্কের দক্ষিণ উপকূলে ভূমধ্যসাগরের তীর ঘেঁষে অবস্থিত মনোমুগ্ধকর শহর মেরসিন। সমুদ্র তীরের সীমানার দিক থেকে মেরসিন রাজ্যের এক পাশে আনতালিয়া, অন্য পাশে আদানা। সমুদ্রবেষ্টিত এই অঞ্চলর বিশেষত মেরসিনের প্রকৃতি ও ইতিহাসের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ রয়েছে। আর এই মেরসিন শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে সমুদ্রের বুকে ভেসে থাকা এক বিস্ময়কর সৌন্দর্যের নাম কিজ কালেসি। বাংলায় যার অর্থ “কুমারী রাজকন্যার দুর্গ” বা “মেইডেনস ক্যাসল”।

ইতিহাস, কিংবদন্তি আর নীল সমুদ্রের অপূর্ব মেলবন্ধনে এই স্থানটি পর্যটকদের কাছে এক স্বপ্নের গন্তব্য। কিজ কালেসির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো সমুদ্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন দুর্গটি। উপকূল থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে ছোট একটি দ্বীপের ওপর নির্মিত এই দুর্গ দূর থেকেই দৃষ্টি কাড়ে। নীল পানির ওপর সাদা ঢেউ ভেঙে যখন দুর্গের দেয়ালে আছড়ে পড়ে, তখন মনে হয় যেন কোনো রূপকথার রাজ্য চোখের সামনে ভেসে উঠেছে।

এই দুর্গটি সাগরের মাঝখানে নির্মাণ সংক্রান্ত কোন সুনির্দিষ্ট ইতিহাস নেই। তবে স্থানীয় কিংবদন্তি অনুযায়ী জানা যায়, এক রাজা তার কন্যাকে সাপের কামড় থেকে রক্ষা করতে সমুদ্রের মাঝখানে এই দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস শেষ পর্যন্ত এক ঝুড়ি ফলের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সাপের কামড়েই রাজকন্যার মৃত্যু হয়। সেই থেকেই দুর্গটির সঙ্গে জড়িয়ে গেছে এক রহস্যময় কাহিনি। এই কিংবদন্তির সঙ্গে বাংলাদেশের বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনিরও এক ধরনের সাংস্কৃতিক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। যা লোকসংস্কৃতির উপাদান বিশেষ করে সমধর্মী কিংবদন্তি ভিন্ন স্থান, সময় এবং প্রেক্ষাপটে সৃষ্টি হয়েও যে ঘটনার সাথে মিল থাকতে পারে সেই দিকটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আগ্রহধর্মী ভ্রমণ পিপাসুদের মনে করিয়ে দেয়।

কিজ কালেসি শুধু ইতিহাস নয়, এর দীর্ঘ বালুকাময় সৈকতও পর্যটকদের মুগ্ধ করে। স্বচ্ছ নীল পানি, শান্ত ঢেউ এবং সূর্যের আলোয় ঝলমলে সমুদ্র- সব মিলিয়ে এখানে সময় যেন অন্যরকম হয়ে ওঠে। সকালে সমুদ্রের ধারে হাঁটা, দুপুরে ঠান্ডা পানিতে সাঁতার, আর বিকেলে সৈকতে বসে সূর্যাস্ত দেখা—প্রতিটি মুহূর্তই হয়ে ওঠে স্মরণীয়। অনেক পর্যটক ছোট নৌকা বা স্পিডবোটে করে দুর্গের কাছে গিয়ে কাছ থেকে প্রাচীন স্থাপত্যটিও ঘুরে দেখেন।

ভ্রমণের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দেয় মেরসিনের বৈচিত্র্যময় খাবার। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের প্রভাবের পাশাপাশি তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের আরব ও কুর্দি রন্ধনশৈলীর ছাপ এখানকার খাবারে স্পষ্ট। বিশেষ করে তানতুনি (মেরসিনের বিখ্যাত খাবার) যে কাউকে মুগ্ধ করবে। সমুদ্রের ধারে বসে তাজা মাছ, কাবাব কিংবা তুর্কি মেজে খেতে খেতে সামনে বিস্তৃত নীল জলরাশি উপভোগ করা যেন এক অনন্য অভিজ্ঞতার জানান দিবে।

যারা ইতিহাস, প্রকৃতি এবং সমুদ্র—এই তিন ধরনের সৌন্দর্যের স্বাদ একসঙ্গে উপভোগ করতে চান তাদের জন্য কিজ কালেসি একটি আদর্শ গন্তব্য। এখানে এলে একদিকে যেমন প্রাচীন দুর্গের ইতিহাস জানা যায় অন্যদিকে উপভোগ করা যায় ভূমধ্যসাগরের অপরূপ সৌন্দর্য। মেরসিন শহর থেকে বাস, প্রাইভেট কার বা ছোট গাড়িতে খুব সহজেই অল্প সময়ের মধ্যে সেখানে পৌঁছানো সম্ভব। যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় ভ্রমণও বেশ স্বাচ্ছন্দ্যময়। সমুদ্রের নীল জলে ভেসে থাকা রহস্যময় এই দুর্গ আপনাকে উপহার দেবে এক ভিন্নধর্মী, স্মরণীয় ভ্রমণ অভিজ্ঞতা যা দীর্ঘদিন পর্যন্ত আপনার মনে গেঁথে থাকবে।

লেখক:

কাজী জহিরুল ইসলাম

শিক্ষার্থী, মেরসিন বিশ্ববিদ্যালয়, তুরস্ক।

শেয়ার করুন:
লিঙ্ক কপি হয়েছে
Loading
আরও নিউজ লোড হচ্ছে...