বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬
Logo
×

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি: আঞ্চলিক শান্তি নাকি নতুন অনিশ্চয়তার শুরু?

লেখক: সাবিনা আহমেদ ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৫১ পূর্বাহ্ন

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ টুইট করে ঘোষণা দিয়েছেন — ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে এবং এই যুদ্ধবিরতি লেবাননসহ সব প্রতিরোধ ফ্রন্টে প্রযোজ্য। যুদ্ধবিরতি শুধু ইরানের মূল ভূখণ্ডে আমেরিকা-ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটা পুরো অঞ্চলে প্রযোজ্য — অর্থাৎ লেবাননে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধ, ইয়েমেনে হুথিদের সঙ্গে যুদ্ধ, ইরাক-সিরিয়ায় আমেরিকান ঘাঁটিতে হামলা — সবকিছু বন্ধ হবে।

শাহবাজ শরিফ উভয় পক্ষকে আগামী শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ইসলামাবাদে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। পাকিস্তান এই ঐতিহাসিক বৈঠকের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে থাকবে।

আমেরিকার প্রতিনিধিদল: প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিফেন উইটকফ।
ইরানের প্রতিনিধিদল: প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।

এই আলোচনায় ইসরায়েলকে একেবারেই আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। কারণ এটা মূলত ইরান-আমেরিকার দ্বিপাক্ষিক আলোচনা। ইরান ইসরায়েলকে কখনো সরাসরি স্বীকৃতি দেয় না এবং তাদের সঙ্গে টেবিলে বসে না। ইরানের দাবি ছিল — আমেরিকাকেই তার মিত্র ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণ করে লেবানন, ইয়েমেন, ইরাক ও ফিলিস্তিনসহ সব প্রতিরোধ ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। তাই ইসরায়েলকে আলাদা করে ডাকার প্রয়োজন পড়েনি।

তবে, ইসরায়েল এখনো এই যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি মেনে নেয়নি। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু স্পষ্ট বলেছেন যে, বিশেষ করে লেবানন ফ্রন্টে এই চুক্তি তাদের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় অভিযান ও গোয়েন্দা তৎপরতা চালিয়ে যাবে। কিছু রিপোর্টে বলা হচ্ছে, ইসরায়েল এখনো সীমিত পর্যায়ে ছোটখাটো হামলা ও তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে।

ইরান এখন যুদ্ধবিরতি মেনে চলছে, কিন্তু খুবই সতর্ক ও প্রস্তুত অবস্থায় আছে। তারা স্পষ্ট সতর্ক করে দিয়েছে — যদি ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে, তাহলে তা পুরো চুক্তির ভঙ্গ হিসেবে গণ্য হবে। ইরান তাৎক্ষণিকভাবে শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া দেখাবে — সম্ভবত মিসাইল হামলা, হরমুজ প্রণালীতে নতুন করে চাপ এবং প্রতিরোধ ফ্রন্টগুলোকে আবারও সক্রিয় করবে। ইরানের বলেছে: “আমাদের আঙুল ট্রিগারের উপর আছে, সামান্য ভুল হলেই পূর্ণ শক্তিতে জবাব দেব।”

এই যুদ্ধবিরতি ইরানের ১০-দফা দাবির ভিত্তিতেই হয়েছে। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল স্পষ্ট জানিয়েছে যে, আমেরিকা তাদের ১০-দফা প্রস্তাবকে “workable basis” হিসেবে মেনে নিয়েছে। এই দফাগুলোর ভিত্তিতেই আলোচনা চলবে এবং দুই সপ্তাহের মধ্যে চূড়ান্ত করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক রেজোলিউশনে পরিণত করা হবে — যা আন্তর্জাতিক আইনের মর্যাদা পাবে।

সংক্ষেপে ইরানের ১০-দফা মূল দাবি:
১. ইরানের বিরুদ্ধে কোনো আগ্রাসন না করার লিখিত গ্যারান্টি
২. হরমুজ প্রণালীতে ইরানের পূর্ণ সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ
৩. ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
৪. সব প্রাথমিক ও সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নেওয়া
৫. জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও আইএইএ বোর্ড অফ গভর্নরসের সব রেজোলিউশন বাতিল
৬. যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ ক্ষতিপূরণ প্রদান
৭. মধ্যপ্রাচ্য থেকে সব মার্কিন যুদ্ধবাহিনী ও ঘাঁটি প্রত্যাহার
৮. লেবানন (হিজবুল্লাহ), ইয়েমেন (হুথি), ইরাক ও ফিলিস্তিনসহ সব প্রতিরোধ ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ
৯. বিদেশে আটকে থাকা সব ইরানি সম্পদ মুক্তি
১০. পুরো চুক্তিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক রেজোলিউশনে রূপান্তর, যা “binding international law” তে রূপান্তরিত হবে।

এখানে দুই পক্ষের নেগোশিয়েশন স্টাইলের মধ্যে বড় পার্থক্য আছে। ট্রাম্পের আমেরিকা খুবই অধৈর্য — দ্রুত চুক্তি শেষ করতে চায়, নিজেদের শর্ত ডিকটেট করে এবং ইরানকে প্রায়ই অবজ্ঞা করে কথা বলে। অন্যদিকে ইরান পূর্ণ সম্মান ও সময় চায়। তারা প্রতিটি দফা নিয়ে গভীর, ধীরে-ধীরে আলোচনা করতে চায় এবং এক ইঞ্চি জমিও ছাড়তে নারাজ। এই দুই ভিন্ন প্রকৃতির স্টাইলের কারণে দুই সপ্তাহে চুক্তি শেষ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম, যদি না আমেরিকা বড় ছাড় দেয়, কিংবা যুদ্ধবিরতির সময়সীমা বাড়ায়।

তবে মনে হচ্ছে না ৬ এবং ৭ নম্বর পয়েন্ট আমেরিকা মানবে, বিশেষ করে ৭; ৬ নিয়ে প্রচুর দর কষাকষির হবে, তবে দেখা যাবে ৬ নম্বরের জন্য ২ নম্বর গৃহীত হবে। এই যুদ্ধবিরতির মাঝেই যে যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যাবে তার কিন্তু কোনও গ্যারান্টি নাই। তাহলে কি কি হতে পারে তার একটা সম্ভাব্য লিস্ট:

১) পূর্ণ সফলতা: আমেরিকা বেশিরভাগ দাবি মেনে নিলে ইরানের জন্য ঐতিহাসিক কূটনৈতিক জয়। তবে ১০ পয়েন্ট নিয়ে অনেক দর কষাকষির হবে।
২) আংশিক চুক্তি: কিছু দফা মানা হবে, কিন্তু বড় দাবি (হরমুজ, ক্ষতিপূরণ, আমেরিকান বেস উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া) মানা হবে না; সেক্ষেত্রে আলোচনা লম্বা হবে। পরিণতি নির্ভর করবে হরমুজ পয়েন্টের উপর।
৩) ইসরায়েল যদি যুদ্ধবিরতি ভাঙে: এটাই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি, হামলা চালালে ইরান পাল্টা জবাব দেবে, হরমুজ ফের বন্ধ হয়ে যাবে এবং যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়বে।
৪) ব্যর্থতা: আমেরিকা কোনো ছাড় না দিলে যুদ্ধ আবার পুরোদমে ফিরে আসবে।

যুদ্ধবিরতি ইরান-ইসরায়েল-জিসিসি কন্ট্রিগুলোকে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে, কিন্তু ইসরায়েলের অস্বীকৃতি ও দুই পক্ষের নেগোশিয়েশন স্টাইলের কারণে পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত অস্থির ও ঝুঁকিপূর্ণ। ইসলামাবাদের বৈঠক কোন দিকে যায়, সেটাই মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

লেখক: সাবিনা আহমেদ

লেখক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

শেয়ার করুন:
লিঙ্ক কপি হয়েছে
Loading
আরও নিউজ লোড হচ্ছে...