জুবায়ের আহমেদ | ০৯/০৪/২০২৬
বাংলাদেশের স্পোর্টস অঙ্গনে একটি বিষয় আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি—রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি যে-ই বোর্ডে আসুক না কেন, দিনশেষে তারা ক্রিকেট ও ফুটবলের সাফল্যই চায়। লক্ষ্য সবার এক হলেও পথ এবং ধরণ ভিন্ন হতে পারে। কেউ সফল হন, কেউ ব্যর্থ; কিন্তু সামগ্রিক বিচারে বাংলাদেশ এখনো তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি।
আন্তর্জাতিক সাফল্য বনাম ঘরোয়া রাজনীতি
সকলেই ভালো চায়—এই যুক্তির পেছনে প্রধান কারণ হলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে লড়াইটা হয় অন্য দেশের বিরুদ্ধে। ফলে দলগত অভ্যন্তরীণ রাজনীতি সেখানে খুব একটা প্রভাব ফেলে না, দেশের জয়ই সেখানে শেষ কথা। কিন্তু গোলমালটা বাধে ঘরোয়া ক্রিকেটের কাঠামোতে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্যের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও, ঘরোয়া ক্রিকেটে দুর্নীতি ও অনিয়ম প্রকট। এই জায়গাটিতেই মূলত রাজনীতি এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের অনুপ্রবেশ ঘটে।
নেতৃত্বের পরিবর্তন ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
বোর্ড নেতৃত্বে কে আসলো বা কে গেলো, তা আমার কাছে মুখ্য নয়; বরং বোর্ডের স্থিতিশীলতা এবং ক্রিকেটের মঙ্গলই বড় কথা। নাজমুল হাসান পাপন সাহেবের বোর্ডের পর ভবিষ্যতে বিএনপি যদি তাদের নিজস্ব লোক দিয়ে বোর্ড সাজায়, তাতেও আমার আপত্তি নেই। আমার সমালোচনার জায়গাটি মূলত তামিম ইকবালের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড ও প্রশাসনিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে।
তামিম ইকবাল আমাদের অন্যতম সেরা ক্রিকেটার, কিন্তু তার সভাপতি হওয়ার এই প্রক্রিয়াটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক:
অভিজ্ঞতার ঘাটতি: ফারুক আহমেদ বা আমিনুল ইসলাম বুলবুলের মতো সিনিয়র ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বোর্ড-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা থাকতে তামিমের মতো একজন তরুণ ও সদ্য সাবেক ক্রিকেটারের সভাপতি হওয়ার ব্যাকুলতা দৃষ্টিকটু।
মরিয়া ভাব: আসিফ মাহমুদের সময়কাল থেকেই বোর্ডে আসার জন্য তিনি যেভাবে সক্রিয় হয়েছেন, তা বাংলাদেশের ক্রিকেটের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এটি কোনো আদর্শ উদাহরণ হতে পারে না।
রাজনৈতিক সমীকরণ: বিএনপি তামিমকে সামনে রেখে বোর্ডে প্রবেশ করেছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা আছে। এমনকি গতকাল সংসদেও বলা হয়েছে—সেরা ক্রিকেটার হিসেবে তাকে বসানো হয়েছে। তবে পর্দার আড়ালে কারা আছেন, তা স্পষ্ট। যদিও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে এটি কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়।
’মায়ের দোয়া’ থেকে ‘বাবার দোয়া’: ট্রলের আড়ালে বাস্তবতা
সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন ‘বাবার দোয়া’ নিয়ে বেশ ট্রল হচ্ছে। তবে আমাদের মনে রাখা দরকার, একসময় বাংলাদেশ দলকে ‘মায়ের দোয়া’ দল বলা হতো। দল যখন বারবার পারফর্ম করতে ব্যর্থ হতো এবং কেবল ‘দোয়া চাই’ বলে পার পেতে চাইতো, তখন থেকেই এই নামের উৎপত্তি। বোর্ডকে নিয়ে নয়, এই ট্রল ছিল দলের পারফরম্যান্স নিয়ে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও প্রত্যাশা
বর্তমানে তামিমের নেতৃত্বাধীন কমিটির মেয়াদ তিন মাস। অনেকেই বলছেন নির্বাচন ছাড়াই এটি চলবে, তবে আমার ধারণা নির্বাচন অবশ্যই হবে। সেখানে হয়তো এই কমিটির অনেকেই প্রার্থী হবেন। তবে বড় প্রশ্ন হলো—তামিম কি পরবর্তী কমিটিতেও সভাপতি থাকবেন?
আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ হলো:
১. বিসিবি হয়তো পরবর্তী স্থায়ী কমিটিতে তামিমকে সভাপতি হিসেবে রাখবে না।
২. তারা তাদের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত কোনো ক্রীড়া ব্যক্তিত্বকে এই পদে বসাতে পারে।
৩. তামিমের জন্য এই তিন মাসের সভাপতি পদটি কেবল একটি ‘সান্ত্বনা পুরস্কার’ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
শেষ কথা
দেশের ক্রিকেটে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন স্থিতিশীলতা। বোর্ডে এমন প্রভাবশালী ব্যক্তি দরকার যারা রাজনীতি ও ক্রীড়া প্রশাসন—উভয় ক্ষেত্রেই দক্ষ। ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামোর আমূল পরিবর্তন ও উন্নতি হলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সাফল্য এমনিতেই আসবে। নেতৃত্বের পালাবদলের চেয়ে ক্রিকেটের কাঠামোগত সংস্কারই হোক আমাদের মূল লক্ষ্য।
