মধ্যপ্রাচ্য আবারও অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে। ইরান ও ইসরায়েল-এর দীর্ঘদিনের ছায়াযুদ্ধ সাম্প্রতিক সময়ে সরাসরি সামরিক পাল্টাপাল্টি হামলার পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই উত্তেজনায় সক্রিয় বা পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যার সামরিক উপস্থিতি ও কৌশলগত অবস্থান পুরো অঞ্চলকে একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মঞ্চে পরিণত করেছে। ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; বরং পারমাণবিক রাজনীতি, প্রক্সি শক্তির ব্যবহার, আঞ্চলিক জোট পুনর্বিন্যাস এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার মতো জটিল উপাদানের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
ইরান–ইসরায়েল বৈরিতার মূল উৎস ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লব। বিপ্লবের আগে শাহ আমলে দুই দেশের মধ্যে অঘোষিত সহযোগিতা থাকলেও ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর তেহরান ইসরায়েলকে অবৈধ রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নকে তার আদর্শিক ও কূটনৈতিক অবস্থানের কেন্দ্রে স্থান দেয়। অপরদিকে ইসরায়েল শুরু থেকেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে দেখে আসছে। ২০১৫ সালের জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন চুক্তি ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর একটি কাঠামো তৈরি করেছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ওই চুক্তি থেকে সরে গেলে নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল হয় এবং পারমাণবিক প্রশ্নে অনিশ্চয়তা নতুন করে তীব্র হয়।
গত এক দশকে এই বৈরিতা প্রক্সি যুদ্ধের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করেছে। লেবাননে হিজবুল্লাহ এবং গাজায় হামাস-এর মতো গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইরানের সমর্থন ইসরায়েলের নিরাপত্তা কৌশলের বড় উদ্বেগের কারণ। সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ চলাকালে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের উপস্থিতি ইসরায়েলের সীমান্ত নিরাপত্তা হিসাবকে জটিল করে তোলে। ফলে ইসরায়েল সিরিয়ায় একাধিক লক্ষ্যভিত্তিক বিমান হামলা চালিয়ে ইরান-সমর্থিত অবকাঠামো ধ্বংসের কৌশল গ্রহণ করে। এতদিন এই সংঘাত মূলত ছায়াযুদ্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের সরাসরি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সেই সীমা অতিক্রম করেছে।
ইসরায়েলের উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, বিশেষ করে Iron Dome, বহু রকেট ও ড্রোন আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে, যা তার প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দৃশ্যমান করেছে। এই পারস্পরিক শক্তি প্রদর্শন এক ধরনের ‘ডিটারেন্স ব্যালান্স’ তৈরি করেছে—যেখানে উভয় পক্ষ পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে না গিয়েও নিজেদের সক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে কৌশলগত বার্তা দিচ্ছে। কিন্তু এই ভারসাম্য অত্যন্ত নাজুক; ভুল হিসাব বা অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দ্রুত পরিস্থিতিকে বৃহত্তর সংঘাতে রূপ দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ঘাঁটি ও নৌ উপস্থিতি বজায় রেখেছে। ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরাক ও সিরিয়ায় লক্ষ্যভিত্তিক আঘাত হেনেছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের প্রধান লক্ষ্য ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ফলে এই সংঘাত আর কেবল তেহরান ও তেলআবিবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান প্রতিদ্বন্দ্বিতার বৃহত্তর কাঠামোর অংশ হয়ে উঠেছে।
আঞ্চলিক কূটনীতিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২০ সালের আব্রাহাম চুক্তি-এর মাধ্যমে কয়েকটি আরব রাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে, যা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করে। এই প্রক্রিয়া ইসরায়েলকে কৌশলগত সুবিধা দিলেও ইরানের দৃষ্টিতে এটি তার প্রভাববলয়ের বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত অবস্থান হিসেবে প্রতিভাত হয়। একই সময়ে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে চীনের মধ্যস্থতায় কূটনৈতিক পুনর্মিলন আঞ্চলিক সমীকরণকে আরও জটিল করেছে।
এই উত্তেজনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো জ্বালানি নিরাপত্তা। পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী বৈশ্বিক তেল পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুট। এখানে সামান্য অস্থিরতাও বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে এবং সরবরাহ চেইনে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে ইরান–ইসরায়েল সংঘাত কেবল আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
সব মিলিয়ে, বর্তমান পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দেয়। এখানে সামরিক শক্তি, আদর্শিক অবস্থান, পারমাণবিক প্রতিরোধ, আঞ্চলিক জোট এবং বৈশ্বিক শক্তির কৌশল একে অপরের সঙ্গে আন্তঃসংযুক্ত। সংঘাত এখনো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয়নি, কিন্তু তার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। একই সঙ্গে কূটনৈতিক পুনঃসংলাপের সম্ভাবনাও রয়ে গেছে। ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কৌশলগত ধৈর্য, হিসাবি পদক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যস্থতার ওপর। মধ্যপ্রাচ্য এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে সামান্য সিদ্ধান্তও আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতির গতিপথ বদলে দিতে পারে।
