বাগেরহাটের ঐতিহাসিক হজরত খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজারসংলগ্ন দিঘির একমাত্র কুমিরটিকে বন বিভাগ কর্তৃক সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মাজারের প্রধান খাদেম। তিন দিন আগে কুমিরের আক্রমণে এক শিশুর মৃত্যুর পর প্রশাসনের সহযোগিতায় গত মঙ্গলবার রাতে প্রাণীটিকে দিঘি থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় এবং বুধবার দুপুরে তা কার্যকর করা হয়।
খাদেমের ক্ষোভ ও প্রতিবাদ: কুমিরটি সরিয়ে নেওয়ার পর মাজার প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মাজারের প্রধান খাদেম ও জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি ফকির তারিকুল ইসলাম। ঐতিহ্যবাহী এই কুমিরটি আকস্মিক সরিয়ে নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “খানজাহান আলী (রহ.)–এর মাজার এবং এই দিঘি সাড়ে ৫০০ বছর ধরে আমাদের পরিবার এবং আমরা দেখভাল করে আসছি। হ্যাঁ, আমাদের ভুলত্রুটি থাকতে পারে। এটা (কুমির) বাগেরহাটের মানুষের একটা সম্পদ। দুর্ঘটনা যেকোনো জায়গায় হতে পারে। তাই বলে কুমিরটি নিয়ে যাওয়া ঠিক হয়নি। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই।”
তিনি আরও যোগ করেন, দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে সাড়ে ৫০০ বছরের ঐতিহ্য ও ইতিহাস নষ্ট করা ঠিক নয়। অনতিবিলম্বে কুমিরটিকে মাজারের দিঘিতে ফিরিয়ে দেওয়ার জোর দাবি জানান তিনি এবং এর সুরক্ষায় প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন।
দর্শনার্থীদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও সুরক্ষার দাবি: নিরাপত্তার স্বার্থে প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে সাময়িকভাবে স্বাগত জানালেও দর্শনার্থীদের অনেকেই চান দিঘিতে আবার কুমির ফিরে আসুক, তবে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বেষ্টনী সহকারে। মোল্লাহাট থেকে সপরিবারে আসা দর্শনার্থী শাহিদা বেগম বলেন, “কোনো মৃত্যুই তো কাম্য নয়। নাতি-নাতনি নিয়ে আসছি। আজ আমার পরিবারে যদি এমন দুর্ঘটনা ঘটত, তবে কী হতো? কুমিরকে আপাতত সরিয়ে নেওয়া ঠিক আছে। তবে এখানে প্রয়োজনীয় বেড়া (বেষ্টনী) দিয়ে কুমিরটি সবার জন্য উন্মুক্ত করা হোক।”
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও বর্তমান পরিস্থিতি: ২০০০ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার’ (আইইউসিএন) বাংলাদেশে মিঠাপানির কুমিরকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করে। মাজারের দিঘির এই কুমিরগুলো ছিল বিরল মিঠাপানির প্রজাতির। সুন্দরবনের করমজল বন্য প্রাণী ও কুমির প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির জানান, দিঘির কয়েক শ একর এলাকাজুড়ে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সবাই আন্তরিক হলে যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সেখানে একটি মিঠাপানির কুমির প্রজনন ও সংরক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব।
খুলনার বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) নির্মল কুমার পাল জানান, উদ্ধারকৃত কুমিরটি বর্তমানে খুলনার বন্য প্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে সুস্থ ও স্বাভাবিক আছে। এটি যেহেতু মিঠাপানির কুমির, তাই একে লোনাপানির সুন্দরবনে ছাড়া হবে না। ঊর্ধ্বতনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তীতে এর স্থায়ী আবাসস্থল নির্ধারণ করা হবে। বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোসা. আতিয়া খাতুন জানিয়েছেন, কুমিরটির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলে তা পরে জানানো হবে।
