প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বললেন, সরকারের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই অর্থবছরে ৪১ লাখ নারীর কাছে এই কার্ড পৌঁছে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। তৃণমূল ও প্রান্তিক পর্যায়ের নারীদের সচ্ছলতা ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করাই সরকারের অগ্রাধিকার।
রাজধানীর শেরাটন হোটেলে আজ মঙ্গলবার সকালে ‘ন্যাশনাল সামিট অন ইয়াং উইমেন’স এমপাওয়ারমেন্ট’ শীর্ষক জাতীয় সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন এসব কথা বলেন।
নারীদের ক্ষমতায়ন ও শিক্ষার মানোন্নয়নের ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, সমাজের বিভিন্ন স্তরের নারীদের প্রয়োজন ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন। তাই তৃণমূল পর্যায়ের নারীদের ক্ষমতায়নের পাশাপাশি সমাজের অন্যান্য স্তরের নারীদেরও মানসম্মত শিক্ষা ও আধুনিক দক্ষতার আলোয় সমৃদ্ধ করে আরও যোগ্য করে তুলতে হবে।
তরুণ ও নারীদের মেধার যথাযথ বিকাশ প্রসঙ্গে মাহ্দী আমিন বলেন, আমাদের দেশে মেধা ও প্রতিভার কোনো ঘাটতি নেই। মননশীলতা, সৃজনশীলতা ও সুপ্ত প্রতিভা আমাদের তরুণ এবং নারীদের মাঝে পর্যাপ্ত রয়েছে। মূল সমস্যা হলো যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার। একজন মানুষের সুপ্ত প্রতিভাকে কীভাবে বাস্তবমুখী ও প্রায়োগিক রূপ দেওয়া যায়, সেই প্ল্যাটফর্ম সরকার এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সম্মিলিতভাবে তৈরি করে দিতে হবে।
বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও রূপকল্পের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, যেহেতু আমরা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সরকার, জনগণের কাছে আমাদের সুনির্দিষ্ট কিছু অঙ্গীকার রয়েছে, একটি স্পষ্ট পলিসি ভিশন রয়েছে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি নির্দিষ্ট রূপকল্প রয়েছে। একই সাথে এই সরকারের একটি গৌরবময় ঐতিহ্য রয়েছে।
দেশের জনমিতিক সুবিধা (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) ও নারীদের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড; আমাদের জনসংখ্যার বিশাল অংশই উদ্যমী তরুণ-তরুণী। পাশাপাশি মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশের বেশি নারী। তারুণ্যে উদ্দীপ্ত এই নারীদের উপস্থিতির মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে পুরো বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবিই ফুটে উঠেছে।
নারীদের প্রতি সরকারের শ্রদ্ধাবোধ ও রাষ্ট্রীয় পলিসির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী একটি কথা প্রায়ই বলেন-তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনজন মানুষ, যাঁদের সাহচর্য ও সমর্থন তিনি পান, তাঁরা হলেন তাঁর মা, তাঁর স্ত্রী এবং তাঁর কন্যা। নারীদের প্রতি তাঁর সেই গভীর অনুভূতি ও শ্রদ্ধাবোধ আমরা রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি নীতিতে প্রতিফলিত হতে দেখি।
ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, বাংলাদেশে নারীদের সার্বিক উন্নয়নে পৃথক মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন এবং অর্থনীতিতে নারীর ক্ষমতায়নের মূল ক্ষেত্র গার্মেন্টস শিল্পের সূচনা হয়েছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। পরবর্তীতে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালুর যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে বাংলাদেশকে বিশ্বে নারীদের ক্ষমতায়নে রোল মডেল করেছিলেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার ইতোমধ্যে দ্বাদশ শ্রেণি থেকে স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত নারীদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থা সম্প্রসারণের ঘোষণা দিয়ে তা বাস্তবায়ন শুরু করেছে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার আশাবাদ ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে যদি প্রকৃত অর্থে অর্থবহ করতে হয়, তবে তা অবশ্যই অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে। জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারীদের রাষ্ট্র পরিচালনায় ও অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসলেই কেবল তা সম্ভব। সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয় বর্তমানে সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই কাজ করে যাচ্ছে।
খেলাধুলা ও শিক্ষাখাতে সরকারের নানা উদ্যোগ তুলে ধরে তিনি জানান, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে দেশব্যাপী খেলাধুলাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিক স্তর থেকেই খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করার অংশ হিসেবে চতুর্থ শ্রেণি থেকে আগামী শিক্ষাবর্ষে নতুন বই চালু করা হচ্ছে। এছাড়া প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলাধুলাকে উৎসাহিত করতে এ বছর প্রায় ১৭ লাখ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাশাপাশি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বিতভাবে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খেলাধুলার পাশাপাশি বিতর্ক, শিল্প সাহিত্য ও কোরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতা আয়োজনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সুপ্ত মননশীলতা বিকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।প্রাথমিক স্তরের ফুটবলের একটি বড় অর্জনের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, কিছুদিন আগে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে আয়োজিত ফুটবল টুর্নামেন্টে ১১ লাখ ছাত্র এবং সমানসংখ্যক ১১ লাখ ছাত্রী অংশগ্রহণ করেছে, যা বিশ্বের বুকে এক বিরল দৃষ্টান্ত। খেলাধুলা কেবল শারীরিক সক্ষমতাই তৈরি করে না; এটি পারস্পরিক যোগাযোগ দক্ষতা বাড়ায়, সাম্য নিশ্চিত করে এবং সমাজে বৈষম্যহীনতার পরিবেশ সৃষ্টি করে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী উপস্থিতি বাড়াতে ও নারী শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন কর্মসূচির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রাথমিক স্তরে উপস্থিতির হার বাড়াতে মিড ডে মিল কর্মসূচি চালু এবং বিনামূল্যে স্কুল পোশাক ও জুতা বিতরণের মতো তিনটি বড় কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এছাড়া মেয়েদের উপস্থিতি ধরে রাখতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ও হাইজিন সুবিধাকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। নারী শিক্ষার্থীদের মননশীলতা ও মেধার পূর্ণ বিকাশে সঠিক শিক্ষাক্রম, বাস্তবসম্মত প্রশিক্ষণ এবং উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাই সরকারের মূল লক্ষ্য।
প্রচলিত সার্টিফিকেট বা সনদসর্বস্ব মুখস্থনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তব জীবনের কর্মক্ষেত্রের উপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশনা হলো – মুখস্থ করে ভালো ফল করার চেয়ে বাস্তব জীবনের জন্য নিজেকে দক্ষ করে প্রস্তুত করা অনেক বেশি জরুরি।
সবাইকে গতানুগতিক পেশার দিকে না ঝুঁকে কারিগরি ও শর্ট কোর্সের দিকে মনোনিবেশ করার আহ্বান জানিয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, সবার জন্য চিরাচরিতভাবে চিকিৎসক, প্রকৌশলী কিংবা আইনজীবী হওয়া জরুরি নয়। অনেকে মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিকের পরপরই কর্মজীবনে প্রবেশ করতে চান। তাঁদের জন্য দেশব্যাপী ৩, ৬, ৯ মাস কিংবা ১ বছর মেয়াদি বিভিন্ন শর্ট কোর্স ও মাইক্রো ক্রেডিটের আধুনিক কারিগরি কোর্স চালু করা হচ্ছে।
প্রবাসে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে ভাষা শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে তিনি জানান, টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার ও ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটগুলোতে বাজারচাহিদা অনুযায়ী বিশেষ দক্ষতা উন্নয়ন এবং বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা-যেমন জাপানি, আরবি, ফরাসি, ইতালীয় কিংবা কোরীয় ভাষা শেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নারীদের কর্মসংস্থানের প্রধান চারটি ক্ষেত্র-সরকারি ও বেসরকারি চাকরি, উদ্যোক্তা হওয়া এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, উদ্যোক্তা হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাই আমাদের নারীরা শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেরাই উদ্যোক্তা হয়ে অন্যদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবেন। এজন্য তারুণ্য ও নারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে সহজ শর্তে জামানতবিহীন স্বল্প সুদের ঋণ এবং উদ্ভাবনী ধারণার জন্য সিড ফান্ডিং ও সরকারি অনুদানের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।

রিজভীর সঙ্গে ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারের সাক্ষাৎ
নিজের ও সন্তানদের নিরাপত্তা চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনায় সংবাদ সম্মেলন নারী উদ্যোক্তার
জননিরাপত্তায় আইজিপির বক্তব্য সময়োপযোগী: পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন