সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে এবার নিষেধাজ্ঞা দিতে যাচ্ছে ইন্দোনেশিয়া। অনলাইনে হয়রানি ও ঝুঁকি থেকে শিশুদের (১৬ বছরের কম বয়সিদের) সুরক্ষার লক্ষ্যে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির সরকার।
শুক্রবার (৬ মার্চ) দেশটির যোগাযোগ ও ডিজিটাল বিষয়ক মন্ত্রী মেউত্যা হাফিদ জানিয়েছেন, আগামী ২৮ মার্চ থেকে ১৬ বছরের কম বয়সিদের ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ প্ল্যাটফর্মে থাকা অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হবে। তথ্য বিবিসি
তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্তের আওতায় প্রথম ধাপে ইউটিউব, টিকটক, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, থ্রেডস, এক্স, বিগো লাইভ এবং রোবলক্সের মতো প্ল্যাটফর্মে কিশোরদের অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় করা হবে। হাফিদের মতে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়া বয়স অনুযায়ী শিশুদের ডিজিটাল জগতে প্রবেশ বিলম্বিত করার ক্ষেত্রে প্রথম অ-পশ্চিমা দেশ হতে যাচ্ছে।
তবে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মগুলোর পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
মন্ত্রী হাফিদ বলেন, শিশুদের সামনে এখন নানা ধরনের বাস্তব ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে পর্নোগ্রাফি দেখা, সাইবার বুলিং, অনলাইন প্রতারণা এবং প্রযুক্তির প্রতি আসক্তি। তার মতে, এসব সমস্যার মধ্যে আসক্তিই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।
তিনি আরও বলেন, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সরকার অভিভাবকদের পাশে দাঁড়াতে চায়, যাতে বড় বড় অ্যালগরিদমভিত্তিক প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে লড়াই করতে তাদের একা না হতে হয়।
শিশুদের নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফ ২০২৩ সালে এক প্রতিবেদনে জানায়, তারা যে ৫১০ জন ইন্দোনেশীয় শিশুর ওপর জরিপ চালিয়েছিল, তাদের প্রায় অর্ধেক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যৌনধর্মী ছবি বা কনটেন্টের মুখোমুখি হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন অনেক অভিভাবক। ৪২ বছর বয়সি আমান্ডা কুসুমো, যিনি দুই সন্তানের মা, বিবিসিকে বলেন যে, কর্মজীবী মা হিসেবে তার সবসময় সন্তানরা অনলাইনে কী করছে তা নজরদারি করা সম্ভব হয় না। বিশেষ করে তার এক কিশোর ছেলে রয়েছে।
তার মতে, সরকারের এমন নিয়ম চালু হলে অভিভাবকদের উদ্বেগ কিছুটা কমবে। তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত শিশু ও অভিভাবক উভয়ের জন্যই ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
তবে তার ১৭ বছর বয়সি ছেলে ম্যাট জোসেফ বিষয়টিকে দুই দিক থেকেই দেখছেন। তিনি বলেন, অনেক শিশুই এখনো নিজের পর্দা ব্যবহারের সময় ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। কিন্তু সরকার যদি পুরোপুরি সব ঝুঁকিপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করে দেয়, তাহলে হয়তো আরও নরম ও বুদ্ধিমান কোনো উপায় ভাবা যেতে পারে।
ম্যাটের মতে, তরুণদের বিনোদনের বড় অংশই আসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে। তাই সরকার যদি তাদের ব্যবহার কমাতে চায়, তাহলে বিকল্প বিনোদনের ব্যবস্থাও বাড়াতে হবে। যেমন টেলিভিশনে ভালো মানের অনুষ্ঠান বা শেখার পাশাপাশি আনন্দ দেওয়ার মতো কনটেন্ট বাড়ানো যেতে পারে।
এদিকে ইন্দোনেশিয়ার শিশু সুরক্ষা সংস্থা জানিয়েছে, সরকারের প্রস্তাবটি পুরোপুরি পর্যালোচনা না করা পর্যন্ত তারা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে পারবে না।
নীতিগত গবেষণা ও মানবাধিকার সংস্থা ইএলসামের গবেষক নুরুল ইজমি বলেন, শিশুদের সুরক্ষা শুধু বয়সভিত্তিক নিষেধাজ্ঞার বিষয় নয়। তিনি উদাহরণ হিসেবে বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নে শিশুদের লক্ষ্য করে প্রোফাইলভিত্তিক বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
তার মতে, শিশুদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে প্রযুক্তির নকশাতেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
ইজমি আরও বলেন, বয়স যাচাই করার জন্য শিশুদের সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করতে হতে পারে। তাই এই তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে সঠিক নীতিমালা মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি সতর্ক করে বলেন, শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গিয়ে তাদের তথ্য পাওয়ার অধিকার বা মত প্রকাশের স্বাধীনতাও যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। মানবাধিকার নীতিমালা অনুযায়ী যে কোনো সীমাবদ্ধতা আইনের ভিত্তিতে, প্রয়োজন অনুযায়ী এবং যথাযথ মাত্রায় হওয়া উচিত।
এই ঘোষণা এমন সময় এসেছে যখন গত ডিসেম্বরে অস্ট্রেলিয়া প্রথম দেশ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোকে বাধ্য করতে শুরু করেছে যাতে ১৬ বছরের কম বয়সিদের অ্যাকাউন্ট খুলতে না দেওয়া হয়। বিশ্বজুড়ে অনেক সরকারই এখন এই নীতির দিকে নজর রাখছে।
অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে সমালোচকরা বলেছেন, এই নিষেধাজ্ঞা যেন অনলাইন গেমিং সাইট যেমন রোবলক্স বা ডিসকর্ডের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হয়, কারণ সেগুলো বর্তমানে এর আওতায় নেই।
এছাড়াও উদ্বেগ রয়েছে যে, বয়স যাচাই প্রযুক্তি কখনো কখনো প্রাপ্তবয়স্কদের ভুল করে আটকে দিতে পারে, আবার অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের শনাক্ত করতে ব্যর্থও হতে পারে।
স্পেনসহ আরও কয়েকটি দেশ অস্ট্রেলিয়ার পথ অনুসরণ করার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্য সরকারও এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা চালুর বিষয়ে জনমত জানতে একটি পরামর্শ প্রক্রিয়া শুরু করেছে। সেখানে তরুণদের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও মতামত দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
এর আগে ইন্দোনেশিয়া অনলাইনে যৌন স্পষ্ট কনটেন্টে প্রবেশ ঠেকাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিল। এর মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট গ্রোকের ব্যবহারও বন্ধ করা হয়েছিল। এছাড়া অনলাইনে পর্নোগ্রাফি ছড়ায় এমন ওয়েবসাইট যেমন অনলি ফ্যানস ও পর্নহাবও দেশটিতে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
