বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬
Logo
×
বাংলাদেশের নির্বাচন-পরবর্তী স্থিতিশীলতা ও নতুন সরকারের প্রতি তুরস্কের পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান

আঙ্কারায় তুরস্ক-বাংলাদেশ যৌথ সংবাদ সম্মেলন: সম্পর্ক জোরদারে নতুন বার্তা

মুহাম্মদ তানভীর ১৮ মার্চ ২০২৬, ০৫:২১ পূর্বাহ্ন

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খালিলুর রহমানের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে (১৪ মার্চ ২০২৬) তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় যৌথ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ যৌথ সংবাদ সম্মেলনের বাংলা অনুবাদ করেছেন তুরস্কে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী এবং সামাজিক অ্যাক্টিভিস্ট মুহাম্মদ তানভীর।

তুরস্ক ও বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা স্মরণ করিয়ে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান প্রেস কনফারেন্সটি শুরু করেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম বৈদেশিক সফর তুরস্ক দিয়ে শুরু করাকে তিনি বাংলাদেশ যে তুরস্ককে গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করে এবং উভয় দেশের মধ্যে যে খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে সে বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন। হাকান ফিদান বলেন, প্রিয় বন্ধুগণ, তিনি (বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী) তাঁর প্রথম দ্বিপাক্ষিক সফর তুরস্কে করছেন। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে আপনারা অবগত আছেন। দীর্ঘ সময় পরে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর পরপরই সরকার গঠন করা হয়েছে। আমরা অবশ্যই তুরস্ক হিসেবে বাংলাদেশের এই স্থিতিশীল প্রক্রিয়াকে শেষ পর্যন্ত সমর্থন করেছি।

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে আমি (আমরা) মনে করি, বাংলাদেশ এখন মুসলিম বিশ্বে এবং নিজ অঞ্চলে যে মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য তা তাকে অবশ্যই পেতে হবে। এ জন্য আমরা একসঙ্গে কাজ চালিয়ে যাব। বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও ঐতিহাসিক, যা হয়তো আপনারা অবগত। ফলে বাংলাদেশ আমাদের অত্যন্ত মূল্যবান অংশীদার।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে অটোমানদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হওয়া বলকান অঞ্চলের দেশগুলোর সমন্বয়ে হওয়া বলকান যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ শাসনামলের অধীনে থাকা আজকের বাংলাদেশিদের পূর্বপুরুষেরা আমাদেরকে যে সাহায্য করেছিল এবং আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যে সমর্থন দিয়েছিল তা এই ঐতিহাসিক ভ্রাতৃত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণগুলোর মধ্যে একটি। আজ আমরা এই দৃঢ় ভিত্তির ওপর আরও শক্তিশালী ও দূরদর্শী অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে চাই।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যেটি আমি ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি। এই নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকারের পর, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরের সুযোগে আমরা অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। আমরা বিশ্বাস করি, এই নতুন সরকারের সঙ্গে আমরা সত্যিই অনেক ফলপ্রসূ কাজ করতে সক্ষম হব।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত বাণিজ্য থেকে শুরু করে বিনিয়োগ এবং প্রতিরক্ষা শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে আমরা কাজ করতে পারি। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে আমরা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে পারি। বর্তমানে আমাদের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ বিদ্যমান সম্ভাবনাকে প্রতিফলিত করে না। এখন প্রায় ১.৩ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য রয়েছে, কিন্তু এটিকে আরও বাড়াতে হবে। আমরা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে আমাদের যৌথ অবস্থান এবং সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে একমত হয়েছি। আমাদের শক্তিশালী অংশীদারিত্ব দক্ষিণ এশিয়া এবং আমাদের অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধিতে সরাসরি অবদান রাখবে।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ, দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার কথা বলতে গিয়ে আমি বিশেষভাবে বাংলাদেশের কাঁধে থাকা বিশাল মানবিক দায় দায়িত্বের দিকে আবারও আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। আপনারা জানেন, সংকটের প্রায় ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও রোহিঙ্গা মুসলমানদের যে ট্র্যাজেডি, তা এখনও চলছে। বাংলাদেশ এক মিলিয়নের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে সমগ্র মানবতার জন্য এক ঐতিহাসিক ত্যাগ স্বীকার করেছে। বাংলাদেশি ভাইদের রোহিঙ্গা মুসলমানদের প্রতি যে আতিথেয়তা ও মানবিক অবস্থান তা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। আমরাও এই বোঝা ভাগ করে নিতে, রোহিঙ্গাদের কষ্ট লাঘব করতে এবং বাংলাদেশকে সহায়তা করতে আমাদের সহায়তা অব্যাহত রেখেছি। আমাদের দেশের দেওয়া মানবিক সহায়তার মোট মূল্য ৮০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তুরস্কের সরকারি উন্নয়ন ও মানবিক সংস্থা টিকা (TIKA), আফাদ (AFAD), তুর্কি রেড ক্রিসেন্ট এবং তুরস্ক দিয়ানেত ফাউন্ডেশন (ধর্ম মন্ত্রণালয়ের) স্বাস্থ্য, আশ্রয়, শিক্ষা এবং অবকাঠামোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহায়তা চালিয়ে যাচ্ছে। রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিরাপদ, সম্মানজনক এবং স্বেচ্ছায় তাদের দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য আমরা আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ঘনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করছি। এই প্রেক্ষাপটে গাম্বিয়া কর্তৃক আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে দায়ের করা মামলাসহ আন্তর্জাতিক আইনি উদ্যোগগুলোকেও আমরা সমর্থন করছি।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ, আমাদের অঞ্চলের স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা এবং সমৃদ্ধি আমাদের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমরা দেখছি যে যুদ্ধ ধীরে ধীরে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। এই ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা বা মানবিক বিষয় নয়, এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকি। আমরা উদ্বিগ্ন যে এই পরিস্থিতি আমাদের অঞ্চলে স্থায়ী শত্রুতার জন্ম দিতে পারে। এই যুদ্ধ যত দ্রুত সম্ভব শেষ হওয়া দরকার। এখন সব পক্ষেরই আলোচনার টেবিলে ফিরে আসা উচিত। স্থায়ী সমাধান শুধুমাত্র সংলাপের মাধ্যমে সম্ভব। তুরস্ক হিসেবে আমরা আমাদের সমস্ত প্রচেষ্টা এই দিকেই কেন্দ্রীভূত করেছি। আমাদের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা চালানো মানে এই নয় যে আমরা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা থেকে একটুও ছাড় দেব। আপনারা জানেন, গতকাল আমাদের দেশের দিকে নিক্ষিপ্ত আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। এই গুরুতর ঘটনার বিষয়ে আমরা ইরানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগে আছি।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ, আমাদের অঞ্চলজুড়ে যে সংঘাত চলছে, তার মূল কারণগুলো আমরা উপেক্ষা করতে পারি না। দীর্ঘদিন ধরে আমরা সতর্ক করে আসছি যে নেতানিয়াহু সরকারের সম্প্রসারণবাদী নীতি এবং মৌলবাদী আদর্শ আমাদের অঞ্চলে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, তা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
ইসরায়েল অঞ্চলে নিজেদের ভূরাজনৈতিক হিসাব চাপিয়ে দিতে বাইরের হস্তক্ষেপ ব্যবহার করছে—যা আমরা মেনে নিতে পারি না।

নেতানিয়াহু সরকার গাজায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন অব্যাহত রেখেছে এবং সেখানে মানবিক পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে। মানবিক সহায়তা যেন বাধাহীনভাবে পৌঁছাতে পারে এবং গাজার মানুষের মৌলিক চাহিদা, বিশেষ করে আশ্রয়, পূরণ করা এখন জরুরি। ইসরায়েল দুই-রাষ্ট্র সমাধানকে ব্যাহত করতে পশ্চিম তীরে নতুন বাস্তবতা তৈরি করার চেষ্টা করছে। পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীরা প্রতিদিন আমাদের ফিলিস্তিনি ভাইদের হত্যা করছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের আল-আকসা মসজিদ বন্ধ করে দেওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি পদক্ষেপ, যা পুরো অঞ্চলে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। এই ধরনের উসকানি থেকে অবিলম্বে সরে আসতে হবে। পবিত্র স্থানগুলো মানবতার যৌথ দায় দায়িত্ব, এগুলোর প্রতি সম্মান দেখাতে হবে।
ইসরায়েল লেবাননকেও আবার একটি মানবিক বিপর্যয় এবং স্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিতে চাইছে। নেতানিয়াহু হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অজুহাতে নতুন এক গণহত্যার দিকে যাচ্ছে কিনা, এ নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ইসরায়েলের চলমান অপরাধের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ, আমরা জানি যে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক সংকটের সমাধান কেবল শক্তিশালী কূটনীতি এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্ভব। এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আজ আমরা আমার প্রিয় সহকর্মীর সঙ্গে আমাদের কূটনৈতিক একাডেমিগুলোর মধ্যে সহযোগিতার জন্য একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছি। এই সমঝোতার মাধ্যমে আমরা তুর্কি এবং বাংলাদেশি কূটনীতিকদের মধ্যে নতুন সহযোগিতার পথ খুলতে চাই। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। এটি গ্লোবাল সাউথের শক্তিশালী কণ্ঠস্বর এবং এশিয়ার অগ্রাধিকারের একজন দক্ষ প্রতিনিধি।

উন্নয়ন, জলবায়ু, শান্তিরক্ষা, অভিবাসন এবং শরণার্থী সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাংলাদেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। তুরস্ক বহু-পাক্ষিক সহযোগিতায় বিশ্বাস করে এবং বাংলাদেশও এই নীতিকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে। এই কারণে জাতিসংঘের মধ্যে আমরা দীর্ঘদিন ধরে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা করছি। এই প্রেক্ষাপটে, আমার প্রিয় ভাইয়ের জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতির প্রার্থিতাকে আমরা স্বাগত জানিয়েছি এবং তুরস্ক হিসেবে আমরা তাকে সমর্থন করছি। আপনারা জানেন, সাধারণ পরিষদ জাতিসংঘ ব্যবস্থার একমাত্র অঙ্গ যেখানে সব সদস্য সমানভাবে প্রতিনিধিত্ব পায়। বাংলাদেশের সক্রিয় ভূমিকা এবং মি. রহমানের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আমরা বিশ্বাস করি তিনি এই দায়িত্ব সফলভাবে পালন করবেন। প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ, আপনারা দেখছেন যে আমাদের সহযোগিতার ক্ষেত্র অত্যন্ত বিস্তৃত এবং দুই ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের জন্য উপযুক্ত। আমরা ভবিষ্যতেও আমাদের বাংলাদেশি বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে যাব। আমরা নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করব এবং দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য একসঙ্গে কাজ করব।

এখন আমি কথা বলার জন্য আমার প্রিয় সহকর্মীকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। ধন্যবাদ।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব খলিলুর রহমান উক্ত প্রেস কনফারেন্স বলেন, আমাকে এই সুযোগ দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। এই সফরের মাধ্যমে আমি আপনাকে সাক্ষাৎ করার সুযোগ পেলাম এবং গণমাধ্যমের সঙ্গেও কথা বলতে পারছি। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যেমনটি বলেছেন আমিও পুনরায় বলতে চাই, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তুরস্কেই আমার প্রথম বিদেশ সফর। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাকে বিশেষভাবে অনুরোধ করেছেন যেন আমি তুরস্কের জনগণ, মাননীয় রাষ্ট্রপতি এরদোয়ান এবং আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে তাঁর আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা পৌঁছে দিই। আমাদের মুসলিম সমাজ, যা আজকের বাংলাদেশ নামে পরিচিত, শতাব্দী আগে তুর্কিদের প্রচেষ্টার মাধ্যমে গঠিত হয়েছিল। তাই আমাদের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক রয়েছে। আমরা এই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে চাই।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী আমার মাধ্যমে একটি বার্তা পাঠিয়েছেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে আমাদের সম্পর্ক সম্পূর্ণ নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। প্রতিরক্ষা শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা একসাথে কাজ করব। এই প্রেক্ষাপটে, আমার জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতির প্রার্থিতাকে সমর্থন করার জন্য আমি আপনাকে এবং তুরস্ককে ধন্যবাদ জানাতে চাই। আমরা বিশ্বাস করি এখন সময় এশিয়ার সময়। সাধারণ পরিষদ জাতিসংঘের সবচেয়ে গণতান্ত্রিক মঞ্চ, যেখানে ভৌগোলিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে নেতৃত্ব ঘুরে ঘুরে আসে। এখন এশিয়ার পালা, এবং বাংলাদেশ একটি প্রকৃত এশীয় দেশ। আমরা একই সঙ্গে গ্লোবাল সাউথের অংশ। তাই তুরস্ক এবং অন্যান্য বন্ধু দেশের সমর্থন আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বিশ্বাস করি, একসাথে কাজ করলে এই প্রার্থিতা সফল হবে।

মাননীয় মন্ত্রী, আমরা যখন গত মাসে দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করি, তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ করে উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত শুরু হয়। এটি শুধু ওই অঞ্চলের দেশগুলোকেই নয়, সারা বিশ্বকেই প্রভাবিত করেছে। আমরা সরাসরি এর প্রভাব অনুভব করেছি। আমাদের চারজন নাগরিক বিমান হামলায় নিহত হয়েছে এবং আরও অনেকে আহত হয়েছে। জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং সমুদ্র পরিবহনে সমস্যাও আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই সংঘাত যত দ্রুত সম্ভব শেষ হওয়া দরকার। সব পক্ষকে আলোচনায় ফিরে আসতে হবে এবং কূটনীতিকে সুযোগ দিতে হবে।

ফিলিস্তিন ইস্যুতে আমাদের অবস্থান তুরস্কের মতোই। আমরা গাজায় যে হত্যাকাণ্ড চলছে তার নিন্দা জানাই। বিশ্ব চোখের সামনে এমন নির্মমতা খুব কমই দেখেছে। আমরা বিশ্বাস করি গাজার পুনর্গঠন শুরু করতে হবে এবং কোনো বাধা ছাড়াই মানবিক সাহায্য পৌঁছাতে হবে। শেষ পর্যন্ত সমস্যার সমাধান দুই-রাষ্ট্র সমাধানের মাধ্যমে হতে হবে। ১৯৬৭ সালের সীমান্তের ভিত্তিতে, পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমি একজন কূটনীতিক হিসেবে ১৯৮০-এর দশকে জাতিসংঘে কাজ করেছি। সেখানে তুরস্কের মিশনে প্রবেশ করার সময় প্রতিদিন “Yurtta sulh, cihanda sulh” (দেশে শান্তি, বিশ্বে শান্তি) লেখা দেখতাম। আমরা তখনও একসাথে কাজ করেছি, আজও করছি। আমরা যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছি, এর মাধ্যমে আমাদের কূটনীতিকরা একসাথে প্রশিক্ষণ নেবে এবং বিশ্বজুড়ে একসাথে কাজ করবে। আমি আবারও আপনাকে ধন্যবাদ জানাই। আমরা এই নতুন যাত্রায় একসাথে এগিয়ে যাব এবং আমাদের সহযোগিতাকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যাব যা আগে কখনও দেখা যায়নি। ধন্যবাদ।

প্রেস কনফারেন্সের শেষ মহূর্তে সিএনএন তুর্ক (CNN Türk) এর সাংবাদিক তুরষ্ক পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল রপ্তানি সংক্রান্ত কিছু স্থানে হামলা চালিয়েছে বলে বলা হচ্ছে। একই সময়ে বলা হচ্ছে যে ইরান থেকে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র তুরস্কের আকাশসীমার দিকে এসেছে। আবার ইরান বলছে তারা তুরস্ককে লক্ষ্য করেনি। এ বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী? ইরানের সঙ্গে কি কোনো যোগাযোগ হয়েছে?

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রশ্নের জবাবে বলেন, প্রিয় বন্ধুগণ, প্রশ্নের মধ্যেই আসলে বোঝা যাচ্ছে যে আমরা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই যে সতর্কবার্তা দিয়েছিলাম, তা কতটা সঠিক ছিল। আমরা শুরু থেকেই বলেছিলাম, যদি এই ধরনের অবস্থান ও আচরণ চলতে থাকে, তাহলে যুদ্ধ অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে পড়বে। এই যুদ্ধ যত দ্রুত সম্ভব থামাতে হবে এবং সব পক্ষকে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসতে হবে। অন্যথায় আমরা দেখব যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হবে। আমাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, ইরানের ওপর হামলা চলতে থাকলে এবং ইরানও যদি অন্য দেশগুলোর ওপর হামলা চালায়, তাহলে এটি একটি বিপজ্জনক চক্রে পরিণত হবে, যেখান থেকে বের হওয়া কঠিন হবে।

এই হামলাগুলো শুধু অঞ্চলের দেশগুলোকেই নয়, বিশ্ব অর্থনীতিকেও হুমকির মুখে ফেলছে। আমরা ইতিমধ্যে এর প্রভাব দেখতে শুরু করেছি। আমরা চাই এই পরিস্থিতি স্থায়ী না হোক, এজন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। তুরস্ক সব ধরনের উসকানির বিরুদ্ধে দৃঢ় থাকবে। আমাদের রাষ্ট্রপতির অবস্থান পরিষ্কার। তুরস্ক এই অন্যায় যুদ্ধে জড়াতে চায় না। আমরা কোনোভাবেই এই যুদ্ধে টেনে আনা হতে চাই না। আমাদের সামরিক সক্ষমতা অত্যন্ত শক্তিশালী, কিন্তু আমরা জানি কখন এবং কোথায় শক্তি ব্যবহার করতে হয়। এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, কূটনীতি কাজ করা। ইরানের ওপর হামলা বন্ধ হতে হবে। ইরানকেও অন্য দেশগুলোর ওপর হামলা বন্ধ করতে হবে। সবাইকে আলোচনায় ফিরতে হবে। আমরা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তারা বলেছে, এই ঘটনার সঙ্গে তাদের সরাসরি সম্পর্ক নেই। আমরা বিভিন্ন পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছি, রাজনৈতিক ও সামরিক উভয় স্তরে। আমাদের প্রথম লক্ষ্য হলো, যুদ্ধ যেন আরও বড় অঞ্চলে ছড়িয়ে না পড়ে, যুদ্ধ যত দ্রুত সম্ভব শেষ হয়, এবং তুরস্ক যেন এই যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়ে।

আনাদুলু এজেন্সি (Anadolu Ajansı) এর সাংবাদিক বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে জিগ্যেস করেন, বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠনের পর তুরস্ক-বাংলাদেশ সম্পর্ক কীভাবে এগোবে? এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির প্রার্থিতা সম্পর্কে কিছু বলবেন? উত্তরে বাংলাদেশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আমাদের নতুন সরকার তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ককে এমন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চায় যা আগে কখনও দেখা যায়নি। গত ১৫ বছর ধরে আমাদের দেশে একটি ভিন্ন পরিস্থিতি ছিল এবং জনগণের ভোটাধিকার সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এবার আমরা একটি শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পেরেছি। আমাদের দল দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয়েছে, যা একটি রেকর্ড। আমরা এই রাজনৈতিক শক্তিকে দেশের উন্নয়নে ব্যবহার করতে চাই। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা। প্রতিরক্ষা শিল্প, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং কূটনৈতিক সহযোগিতা, সব ক্ষেত্রে আমরা একসাথে কাজ করতে চাই। আমি তুরস্কের জনগণকে বলতে চাই আমরা আপনাদের পাশে থাকব, এবং আমরা জানি আপনারাও আমাদের পাশে থাকবেন।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির প্রার্থিতা সম্পর্কে বলতে চাই, বাংলাদেশের প্রার্থিতা আসলে এশিয়ার প্রার্থিতা। আমরা একটি এশীয় দেশ এবং একই সঙ্গে গ্লোবাল সাউথের অংশ। জাতিসংঘে ভৌগোলিক রোটেশন নীতি অনুযায়ী এবার এশিয়ার পালা। আমরা বিশ্বাস করি এই নীতি সম্মান করা উচিত। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো সাধারণ পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাই আমরা বিশ্বাস করি তাদের সমর্থন পাব। আমি জাতিসংঘে দীর্ঘদিন কাজ করেছি এবং এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় দেশগুলোর সমর্থন পাব বলে আশা করি। আমরা খুব সক্রিয়ভাবে কাজ করছি এবং তুরস্কের সমর্থন আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বিশ্বাস করি আমরা সফল হব। ধন্যবাদ।

অনুবাদক: মুহাম্মদ তানভীর

রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট ও মাস্টার্স শিক্ষার্থী, ইবনে খালদুন বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক সভাপতি, ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টস কমিশন, তুর্কি ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন।

শেয়ার করুন:
লিঙ্ক কপি হয়েছে
Loading
আরও নিউজ লোড হচ্ছে...