সরকারি হাসপাতাল। সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবার শেষ আশ্রয়স্থল। বিনামূল্যে সেবা পাওয়ার আশায় এসব হাসপাতালে যান সাধারণ মানুষ। এই সেবা পেতে গিয়ে পদে পদে পোহাতে হয় ভোগান্তি। চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনৈতিক বাণিজ্যের শিকার হচ্ছেন রোগীরা। সুযোগ থাকলেও বিনামূল্যের ওষুধ মিলে না। রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা, অপারেশনসহ রোগী ভর্তিতে কমিশন নিয়ে পাঠানো হয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। জরুরি সেবা নিতে আসা গুরুতর অসুস্থ বা আহত রোগীদের প্রয়োজনে মিলে না ট্রলি, হুইলচেয়ার। অতি সাধারণ এই সেবা পেতেও গুনতে হয় অর্থ। রোগীদের জন্য তৈরি খাবার নিয়ে আছে এন্তার অভিযোগ। হাসপাতালের নোংরা অপরিচ্ছন্ন শৌচাগার যেন রোগ ছড়ানোর এক একটি কেন্দ্র। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় রোগীদের। হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ পেতে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়।
ওষুধ নিয়ে বাণিজ্য, জিম্মি রোগী:
কম খরচে চিকিৎসার আশায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে ভিড় করেন হাজারো রোগী। বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে এসব হাসপাতালই চিকিৎসার শেষ ভরসা। চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের বিভিন্ন ওষুধ সরকার বিনামূল্যে দিয়ে থাকে। আর এই বিনামূল্যের ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামকে ঘিরে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রতিদিন হাসপাতালের সেন্ট্রাল স্টোর থেকে নির্ধারিত ইনডেন্টের (চাহিদাপত্র) মাধ্যমে দায়িত্বপ্রাপ্ত ইনচার্জ নার্সরা অপারেশন থিয়েটার ও আন্তঃবিভাগে নিয়ে যান। পরে ওইসব জায়গা থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে বেহাত হচ্ছে মূল্যবান ওষুধ ও সার্জিক্যাল সামগ্রী। আবার কখনো এসব ওষুধের ক্রেতারাও সরাসরি হাসপাতালে এসে ওষুধ ও সার্জিক্যাল সামগ্রী সিন্ডিকেটের সদস্যদের কাছ থেকে ক্রয় করে নিয়ে যাচ্ছেন।
ইনডেন্ট থেকে রোগীর হাতে পৌঁছানোর আগেই উধাও: প্রতিটি ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা সব রোগীর জন্য যে পরিমাণ ওষুধ, স্যালাইন, ইনজেকশন এবং অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম দরকার, তার ইনডেন্ট তৈরি করেন নির্দিষ্ট ওয়ার্ডের সিস্টার ইনচার্জ। সহকারী রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষর করা ইনডেন্ট অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের সিস্টার ইনচার্জ স্টোর থেকে ওষুধ ও অন্যান্য সামগ্রী সংগ্রহ করেন। স্টোর থেকে ওষুধ বের হয় ইনডেন্ট অনুযায়ী। তবে সেখান থেকে রোগীর কাছে পৌঁছানোর পথে সেটি সরিয়ে ফেলা হয়। রোগীকে বলা হয়, সব ওষুধ পাওয়া যায়নি। বাইরে থেকে সংগ্রহ করতে হবে। আবার অপারেশন থিয়েটারে অতিরিক্ত ওষুধ ও ইনজেকশন নার্সরা আলাদা জায়গায় জড়ো করেন। পরে ক্লিনারদের যোগসাজশে নানাভাবে ওষুধ সরিয়ে ফেলা হয়।
হাসপাতালের ভেতরেই ওষুধ বিক্রি: মিটফোর্ড হাসপাতালের ৪০১-৪০২ নম্বর কক্ষের সামনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে প্রমাণ মিলেছে ওষুধ কেনাবেচার। দেখা গেছে, হাসপাতালের একজন কর্মচারী জালের তৈরি একটি ব্যাগে করে ওষুধ নিয়ে এসেছেন। বারান্দায় শুয়ে থাকা একজন রোগীকে তিনি জিজ্ঞেস করছিলেন, ‘ওষুধ লাগবে?’ ওষুধের ব্যাগ নিয়ে তিনি চলে যান ওয়ার্ডে। এই সূত্র ধরে ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, তিনি একজন রোগীর শয্যার পাশে ফ্লোরে রোগীর স্বজনকে ওষুধ বুঝিয়ে দিচ্ছেন।
বহির্বিভাগ থেকে যেভাবে ওষুধ সরানো হয়: ওষুধ চুরির পেছনে থাকেন হাসপাতালের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা। হাসপাতালের ওষুধ বিতরণব্যবস্থায় সাধারণত চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন/স্লিপের মাধ্যমে রোগী নির্দিষ্ট বিতরণকেন্দ্র থেকে ওষুধ সংগ্রহ করেন। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের বহির্বিভাগের ওষুধ বিতরণকেন্দ্রটি দুই নম্বর ভবনের সামনে অবস্থিত। কিছু কর্মচারী নিজের আত্মীয়-স্বজন অসুস্থ বলে চিকিৎসক থেকে স্লিপে দামি ওষুধগুলো লিখে নেন। পরে সেই স্লিপ দেখিয়ে ওষুধ বিতরণ কেন্দ্র থেকে ওষুধ সংগ্রহ করে জমা করেন। আবার অনেক কর্মচারী চিকিৎসকদের অজ্ঞাতে তাদের সিল ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে অতিরিক্ত ওষুধ সংবলিত জাল স্লিপ তৈরি করে। পরে সেই স্লিপ ব্যবহার করে বিতরণ কেন্দ্র থেকে ওষুধ সংগ্রহ করে। সাধারণত স্লিপ থাকা সত্ত্বেও ১০ বা ২০টির বেশি ওষুধ সাধারণ রোগীকে দেয়ার নিয়ম নেই। কিন্তু বিতরণকেন্দ্রের কিছু কর্মচারীর সঙ্গে যোগসাজশ থাকায় তারা এর চেয়েও বেশি ওষুধ সংগ্রহ করতে পারেন। পরে তারা এই ওষুধগুলো বাইরে এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা রোগীদের কাছে বিক্রি করেন। লালবাগ থেকে স্ত্রীকে নিয়ে এসেছিলেন মিন্টু মিয়া। ৫ দিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে ফেরার পথে তার সঙ্গে কথা হয়। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এখানে সব কিছু বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে। এমনকি এক্স- রেও বাইরে থেকে করতে হয়েছে। তারা বলে ওষুধ নেই। অথচ টাকা দিলে এখানের ক্লিনাররা ওষুধ দিয়ে যায়।
সন্তান অসুস্থ। দোহার থেকে ঢামেকে এসেছেন ফাতেমা। তিনি বলেন, আমার মেয়ে এক্সিডেন্ট করেছে। ৪ দিন থাকার পর ডাক্তার রিলিজ দিয়েছে। তাই বাসায় চলে যাচ্ছি। এখানে হাসপাতাল থেকে কিছু ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছিল। আবার অনেক সময় ওয়ার্ড বয়দের বললে তারা কম দামে ওষুধ এনে দিয়ে যায়।
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মুন্সীগঞ্জের বাসিন্দা আমিন হোসেন বলেন, এখানে কিছু কিছু ওষুধ দেয়া হয়। বাকিগুলো বাইরে থেকে নিয়ে আসতে হয়। তবে ওয়ার্ড বয় ও ক্লিনারদের বললে তাদের সংগ্রহে থাকা ওষুধ এনে দেয়। সেক্ষেত্রে তারা পাইকারি দাম রাখে।
সার্বিক বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীসহ দায়িত্বরত কর্মকর্তারা বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছেন। বিষয়টিকে সুপারভিশনও বলতে পারেন। নজরদারিও বলতে পারেন। আমাদের যতটুকু সক্ষমতা আছে, তা দিয়ে আমরা চেষ্টা করছি। আমাদের নিজস্ব কোনো ফোর্স নেই। থাকলে তাদের দিয়ে নিয়মিত নজরদারি করানো যেত। আমাদের কোনো ম্যাজিস্ট্রেসি কিংবা পুলিশ পাওয়ার নেই। অভিযান কিংবা দেখভাল করতে যেতে হয় রুটিন ভিজিটের বাইরে। তখন আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেই। এসব ঘাটতি পূরণ করতে সময় লাগবে। আশা করি দ্রুত নিয়মের মধ্যে চলে আসবে।
সূত্র: মানবজমিন
