বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
Logo
×

একজন লেখকের বহুমুখী চিন্তা প্রসঙ্গে

প্রথম সমাচার ডেস্ক ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:১৮ অপরাহ্ন

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বাহিরে আমাদের পরিবার ও বন্ধুবান্ধব মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১০/১৫ জন ব্যক্তি থাকতে বড়জোর, যাদের সাথে আমাদের চিন্তার মিল হয় অথবা মিল না হলেও সমস্যা হয় না, শ্রদ্ধাবোধ থাকে ঘনিষ্ঠতার খাতিরে।

বাস্তবের যে সংখ্যাটা আমি ১০/১৫ বললাম, এটা আসলেই এতো কমই, অনেকের ক্ষেত্রে আরো কম। পরিবারের বাহিরে ১/২ জন ক্লোজ মানুষ থাকে বড়জোর।

অপরদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাদের জন্য বন্ধু তালিকাটা বেশ লম্বা, ফেইসবুক নিয়ম করেছে ৫ হাজার। অনেকের ৫ হাজার পূর্ণ হয় বা। এক হাজারের বেশি তো কমনই। মাঝামাঝি স্ট্যান্ডার্ড যদি ২৫০০ ও ধরি, তাহলেও বাস্তব জীবনের চেয়ে কয়েকশগুণ বেশি ফ্রেন্ড হয় ফেইসবুকে। এই ফ্রেন্ডরা কিন্তু প্রকৃত অর্থে বাস্তব জীবনের মতো ফ্রেন্ড না। অধিকাংশই ভিন্নমতের ও পথের। ভিন্ন ধর্মের মানুষও থাকে এখানে। আবার ফেইসবুকের এই সর্বোচ্চ ৫ হাজার ফ্রেন্ডের গন্ডি পেরিয়ে অনেকের ফলোয়ার থাকে ১০/২০ হাজার বা ২০/৫০ লাখ পর্যন্ত। এই সংখ্যাটা বিশাল। অন্তত ২০ হাজার ফলোয়ার হিসেব করলেও বাস্তবের তুলনায় এটা অনেক বড় দুনিয়া।

ফেইসবুকের দুনিয়া, বাস্তবের দুনিয়ার মতোই বিস্তৃত। পাবলিক করে রাখা যেকোন পোষ্ট যেকোন দেশের লোকেরা দেখতে পারে এবং মন্তব্য করতে পারে। এইক্ষেত্রে আমরা যখন কোন পোষ্ট দেই, বিশেষ করে মতামত ও আলোচনা করে, তখন যেকেউ সেখানে মন্তব্য করার অধিকার রাখে পাবলিক পোষ্ট হলে। ছবির ক্ষেত্রেও একই কথা। আমরা লেখা পোষ্ট বা পোষ্ট করার সময়ই ভাবা দরকার এখানে একাধিক ভিন্নমতের মানুষ মন্তব্য করতে পারে। শুধু ভিন্নমত নয়, হতে পারে আমার আলোচনা বা মতামত ভুল, কেউ শুধরে দিলো বা সমালোচনা করলো, যেকোন কিছু হতে পারে, এমনকি বিশ্রি গালাগালি পর্যন্ত হবে, এই ভাবনা মাথায় রেখেই আমাদের পোষ্ট করতে হয়, করা উচিত।

বাস্তব জীবনের কথা শুরুতে বলেছিলাম, আমাদের মতামত ও চিন্তাকে গ্রহণ করবে আমাদের পরিবার ও কিছু শুভাকাঙ্খি, অনেক সময় ঘরের মানুষ বা শুভাকাঙ্খিরাও ভিন্নমত পোষণ করে। তবে তারা পরিবার ও শুভাকাঙ্খি হিসেবে ভিন্নমতের হলেও অন্তত বিদ্বেষ দেখাবে না, সুন্দর করে আলোচনা করবে বা চুপ থাকবে। কিন্তু অনলাইনের দুনিয়ায় আপনি এমন চিন্তা করলে, সেটা আপনার ভুল। অনলাইন দুনিয়া অনেক বড়, অনেক মানুষ, অনেক মত, পথ, উপর বলেছি।

এবার মূল কথা বলি, যারা লেখালেখি করেন, তাদের মধ্যে গল্প, কবিতা, উপন্যাস যে যেভাবে ইচ্ছা লিখতে পারেন, সেখানে আসলে বলার কিছু নেই, কারন সেগুলো গল্প, বাস্তব নয়। কিন্তু সমসাময়িক ইস্যু, রাষ্ট্রের বিধান, ধর্ম, ন্যায় অন্যায়, এসব আলাপের ক্ষেত্রে ভিন্নমত দেখা যায়। আমি নিজে আলাপ করলেও ভিন্নমত দেখতে পাই, সহমত দেখতে পাই। ভিন্নমতের অনেকে সুন্দর করে বলে, কেউ ভুল ধরিয়ে দেয়, কেউবা গালি দেয়, অনেক কিছু হয়। এইসব মানতে কষ্ট হয়, তবে মেনে নিতে হয়। কারন আপনি লিখবেন, আরেকজন ভিন্নমত দেবে গালি দেবে, আপনি যদি মানতে না পারেন, বারবারই কষ্ট দেখিয়ে কাউন্টার তর্ক করতে থাকেন, তাহলে আপনাকে লেখালেখি ছেড়ে দিতে হবে। এইক্ষেত্রে করণীয় ও সহজ কাজ হলো ভিন্নমত ও পথকে মেনে নেয়া। নিজের কথায় ভুল হলে স্বীকার করা, শুধরে নেয়া।

লেখক হলে চিন্তা শক্তি সবচেয়ে বড় সম্পদ, চিন্তার দৈনতা থাকলে বা বহুমুখীতা না থাকলে সমস্যা। সব লেখা ও আলোচনার ক্ষেত্রে হয়তো পুরোপুরি স্বচ্ছতা বা বহুমুখি ভাবনা একত্রে করা যায় না, তবে কেউ যখন ধরিয়ে দেবে বা বলে দেবে, তখন অবশ্যই ভাবনায় আনতে হবে, মেনে নিতে হবে। মেনে নিতে না পারলে এড়িয়ে যেতে হবে।

স্পষ্ট বিধান অর্থাৎ কোরআন ও সুন্নাহর যেসকল বিষয় ক্লিয়ার করা, তার বাহিরে অনেক বিষয় থাকে, যেগুলো আলোচনা ও মতামতের ভিত্তিতে সমাধানযোগ্য। দেখা যায়, ধর্মের এইসব মতামতও মানতে চায় না স্বয়ং অনেক মুসলিম ও আলেমই। সেখানে অন্যান্য বিষয়ে মতামত দিলে বা চিন্তা করলে তা যে শতভাগ শুদ্ধ হবে, তা কখনোই ঠিক নয়। এই বিষয়টা বুঝতে হবে লেখক আলোচকদের।

যারা নিজেদের মতামতকেই শ্রেষ্ঠ ও নির্ভূল মনে করে এবং আলোচনা-তর্কের পথ বন্ধ করে দেয়, তারা একরোখা-সাইকো। এটা ঠিক যে, সাধারণ চিন্তা থেকে বিতর্ক এড়াতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই কমেন্টবক্স বন্ধ করে রাখে। এমনক্ষেত্রে অনেকে শেয়ার দিয়ে ভিন্নমত পোষণ করে। আর যে বিষয়ে কমেন্ট বক্স ওপেন থাকে, সেই বিষয়ে মন্তব্য করলে তা অবশ্যই স্বাভাবিক ভাবে গ্রহণ করতে হবে।

মনে রাখা জরুরী, ফেইসবুকের আলোচনার জবাবে যারা আলোচনা করে, তারা লেখকের শুভাকাঙ্খিরূপেই আসে, ভিন্নরূপে আসা ব্যক্তিরা গালা-গালি করে, বিদ্বেষ ছড়ায়। আলোচনা সাপেক্ষে সমাধানযোগ্য বা একটা সুন্দর ফল আনা যাবে, এমন বিষয়গুলোতে অবশ্যই আলোচনা জরুরী। একমুখী আলোচনাই শেষ কথা নয়। এক বিষয়ে একজনের দেখার দৃষ্টি, অন্যজনের দেখার দৃষ্টি থেকে ভিন্ন হতে পারে, হয়ও। তাই চিন্তার ক্ষেত্রে ডাইভারসিটি না থাকলে সমস্যা, একজন লেখককে অবশ্যই বহুমুখী চিন্তার অধিকারী হতে হয়, বিশেষ করে লেখার বিষয় যখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।

অনেক কথা হলো, অনলাইন বাস্তবতায় ফেইসবুক আমাদের ৫ হাজার ফ্রেন্ড দেয়, সবাই কিন্তু বাস্তবের মতো পারিবারিক শুভাকাঙ্খত ফ্রেন্ড নয়। আবার হাজার লক্ষ ফলোয়ার হিসেব করলে তো এটা একটা দুনিয়া, যেখানে অনেক মত ও পথ আছে। তাই আলোচনা ও চিন্তার প্রকাশের ক্ষেত্রে অবশ্যই ভিন্নমত মানতে হবে, নিজের চিন্তায় দৈনতা ও ভুল থাকলে শুধরাতে হবে, শিখতে হবে, জানতে হবে। আমি অন্তত প্রতিনিয়ত এটা চেষ্টা করি। প্রতিটি কাজ থেকে ভুলের অংশটা উপলব্ধি করতে চেষ্টা করি, শিখি, ভিন্নমতকে গ্রহণ করতে চেষ্টা করি এবং গালিবাজদের “আসসালামু আলাইকুম” বলে শান্তির বার্তা দিয়ে নিজেকেও শান্ত করি।

জুবায়ের আহমেদ
লেখক ও আলোচক

শেয়ার করুন:
লিঙ্ক কপি হয়েছে
Loading
আরও নিউজ লোড হচ্ছে...