রাজনীতির ময়দানে বিরোধী দলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি সবচেয়ে তীব্র লড়াই অনেক সময় ঘটে নিজ দলের অভ্যন্তরেই। গ্রুপিং, লবিং, প্রভাব বিস্তার—বিএনপি, জামায়াত কিংবা এনসিপি; প্রায় সব বড় দলেই এই বাস্তবতা কমবেশি বিদ্যমান। এবার সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়নকে কেন্দ্র করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র ভেতরেও তেমনই এক নীরব টানাপোড়েন সামনে এসেছে।
দলীয় সূত্র বলছে, সংরক্ষিত নারী আসনে এনসিপির মনোনয়নপ্রাপ্ত দুই মুখ—মনিরা শারমিন ও নুসরাত তাবাসসুমকে ঘিরে শুরু থেকেই অভ্যন্তরীণ হিসাব-নিকাশ চলছিল। মনিরা শারমিনের ক্ষেত্রে সরকারি চাকরি থেকে অব্যাহতির তিন বছর পূর্ণ না হওয়ায় আইনগত জটিলতা তৈরি হয়। নির্বাচন কমিশনের বিধান অনুযায়ী এ বিষয়টি তার প্রার্থিতার পথে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
তবে শুধু আইনি জটিলতাই নয়, দলীয় অভ্যন্তরে তার মনোনয়ন নিয়ে আপত্তিও ছিল বলে জানা গেছে। এনসিপিরই একটি প্রভাবশালী অংশ নেপথ্যে মনিরা শারমিনের প্রার্থিতা ঠেকাতে সক্রিয় ছিল এবং নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছে—এমন আলোচনা এখন রাজনৈতিক অন্দরমহলে ঘুরছে। অর্থাৎ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেবল আইনগত ছিল না; ছিল দলীয় গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও।
অন্যদিকে নুসরাত তাবাসসুমের মনোনয়ন বৈধতা পাওয়ার পর আজই তার গেজেট প্রকাশ এবং শপথ গ্রহণের বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত বলেই ধরা হচ্ছিল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে মনিরা শারমিনের পক্ষ থেকে দেওয়া একটি চিঠি পুরো প্রক্রিয়ায় সাময়িক স্থবিরতা তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মনিরার রিট শুনানি এখনো বিচারাধীন থাকায় নির্বাচন কমিশন থেকে আপত্তি থাকলে লিখিতভাবে তা জানাতে বলা হয়েছিল, আর সেই সুযোগেই নতুন করে বিষয়টি সামনে আনা হয়।
যদিও আইন বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, চলমান রিটে মনিরা শারমিনের পক্ষে বড় ধরনের ইতিবাচক ফল আসার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। তারপরও দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার কারণে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
এখন সব নজর রয়েছে আগামী শুনানির দিকে। যদি আদালতের পর্যবেক্ষণ মনিরা শারমিনের অনুকূলে যায়, তাহলে সংরক্ষিত আসন নিয়ে এনসিপির ভেতরে আরও বড় ধরনের নাটকীয়তা তৈরি হতে পারে। আর যদি তা না হয়, তাহলে নুসরাত তাবাসসুমের গেজেট প্রকাশের পথ পুরোপুরি পরিষ্কার হয়ে যাবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ঘটনাপ্রবাহ একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—নতুন দল হলেও এনসিপি অভ্যন্তরীণ গ্রুপিংয়ের বাস্তবতা থেকে মুক্ত নয়। সংরক্ষিত আসনের একটি মনোনয়নকে কেন্দ্র করে যে নেপথ্য প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে, তা দলটির সাংগঠনিক সংহতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। এখন দেখার বিষয়, আইনি নিষ্পত্তির পর এই দ্বন্দ্ব কতটা প্রশমিত হয়, নাকি নতুন করে আরও বিভাজনের জন্ম দেয়।
