বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
Logo
×
ভয়াল ২৯ এপ্রিল

দেড় লক্ষ মৃত, এক কোটি গৃহহীন—৩৫ বছর পরেও শিউরে ওঠে মন

প্রথম সমাচার ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১১:১৯ পূর্বাহ্ন

ইতিহাসের এক কালো রাত

বিশেষ প্রতিবেদন | ২৯ এপ্রিল, বার্ষিক স্মরণ সংখ্যা

আজ থেকে ৩৫ বছর আগে, ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল রাতে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে নেমে এসেছিল এক অভূতপূর্ব মহাপ্রলয়। ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর সেই ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় দেড় লক্ষ মানুষ। গৃহহীন হয়ে পড়েছিলেন এক কোটিরও বেশি।

ঝড়ের জন্ম

সেই বছরের ২২ এপ্রিল বঙ্গোপসাগরের বুকে একটি লঘুচাপের সৃষ্টি হয়। দিনে দিনে শক্তি সঞ্চয় করে ২৪ এপ্রিল এটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়। ২৮ এপ্রিল রাত থেকে এটি ভয়াবহ গতিতে উপকূলের দিকে ধেয়ে আসতে থাকে। ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগ একে সর্বোচ্চ বিপদমাত্রার ‘সুপার সাইক্লোনিক স্টর্ম’ হিসেবে চিহ্নিত করে। আন্তর্জাতিক আবহাওয়া সংস্থাগুলো এটিকে আটলান্টিকের ক্যাটাগরি-৫ হারিকেনের সমতুল্য বলে জানায়।

কেমন ছিল সেদিনের প্রলয়ংকারী রাত

২৯ এপ্রিল দিবাগত রাতে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার বেগে ঝড়টি আঘাত করে চট্টগ্রামের দক্ষিণ উপকূলে। সঙ্গে আসে ৩০ ফুট পর্যন্ত উঁচু জলোচ্ছ্বাস, যা টানা ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা ধরে উপকূল গ্রাস করতে থাকে।

কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বাঁশখালী, চকরিয়া, কুতুবদিয়া ও মহেশখালীসহ একের পর এক জনপদ পানির নিচে তলিয়ে যায়। কর্ণফুলীর মোহনায় পাটেং-এর কংক্রিটের বাঁধও রুখতে পারেনি সেই ঢেউ।

কুতুবদিয়া — এক দ্বীপের মৃত্যু

চট্টগ্রামের উপকূলীয় দ্বীপ কুতুবদিয়ায় সেই রাতে মারা যান ২০,০০০-এরও বেশি মানুষ। দ্বীপের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ বাড়িঘর সম্পূর্ণ মাটির সঙ্গে মিশে যায়। সব গবাদিপশু মারা পড়ে। কিছু ছোট দ্বীপে একটি প্রাণও বাঁচেনি। চট্টগ্রাম শহরে মারা যান প্রায় ২৫,০০০ এবং বাঁশখালীতে প্রায় ৪০,০০০ মানুষ।

উপেক্ষিত সতর্কতা, অকল্পনীয় মৃত্যুর ইতিহাস

আগাম সতর্কতা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সতর্কবার্তা অনেকের কাছে পৌঁছায়নি, আবার অনেকে বিশ্বাস করেননি। বহু মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে দেরি করেন। ঝড় শুরু হয়ে গেলে আর পথ মেলেনি।

পরে গবেষণায় দেখা যায়, যারা পাকা কাঠামোতে আশ্রয় নিতে পেরেছিলেন, তারা সবাই বেঁচে গেছেন। আর যারা পারেননি, তাদের মধ্যে মৃত্যুহার ছিল ২২ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি প্রাণ হারিয়েছে শিশু, বৃদ্ধ ও নারীরা।

ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র

মোট ১,৩৮,০০০ থেকে ১,৪৫,০০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল সেই রাতে। ১ কোটিরও বেশি মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন। ১০ লক্ষ গবাদিপশু মারা যায়। ৭৯,০০০-এরও বেশি ঘরবাড়ি, স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র ধ্বংস হয়।

ফসলহানিতে দেখা দেয় দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা। ক্ষয়ক্ষতির মোট পরিমাণ ছাড়িয়ে যায় ১৭০ কোটি মার্কিন ডলার।

ত্রাণ ও পুনর্গঠন ব্যবস্থাপনা

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে জরুরি সাহায্য চেয়ে আবেদন করেন। বিশ্বের বহু দেশ সাড়া দেয়। তবে ক্ষতির বিশালতার তুলনায় ত্রাণ সহায়তা ছিল অপ্রতুল।

ইতিহাসের নির্মম অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা

এই মহাদুর্যোগ বাংলাদেশকে বদলে দিয়েছে। উপকূলজুড়ে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার বহুতল আশ্রয়কেন্দ্র। শক্তিশালী হয়েছে পূর্বাভাস ব্যবস্থা। স্বেচ্ছাসেবীদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কার্যক্রম নিয়মিত চলছে। এর ফলেই পরবর্তী বড় ঘূর্ণিঝড়গুলোতে মৃতের সংখ্যা লক্ষ থেকে নেমে এসেছে মাত্র কয়েকশোতে।

আজ সেই ভয়াল রাতের ৩৫ বছর পরেও উপকূলের মানুষ স্মরণ করেন সেই কালো রাতকে। প্রতিটি বছর ২৯ এপ্রিল আসে একটি নীরব স্মৃতিচারণ নিয়ে — যেন মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির সামনে মানুষ কতটা অসহায়, আর প্রস্তুতিই পারে সেই অসহায়ত্বকে জয় করতে।

তথ্যসূত্র: বিভিন্ন সাইট ও সংবাদমাধ্যম

শেয়ার করুন:
লিঙ্ক কপি হয়েছে
Loading
আরও নিউজ লোড হচ্ছে...