কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের খোঁজে দেশজুড়ে বাড়ি বাড়ি তল্লাশি শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আগামী ২৩ জুন দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য ঝটিকা মিছিল, নাশকতা ও সংঘাতের আশঙ্কায় রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় গত কয়েকদিন ধরে চিরুনি অভিযান চলছে বলে নিশ্চিত করেছেন একাধিক জেলার পুলিশ সুপার (এসপি)।
বিভিন্ন জেলার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কর্মসূচি ঘোষণার পরপরই পুলিশ সদরদপ্তর থেকে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। তবে তার আগে থেকেই পুলিশ গ্রেপ্তার অভিযান শুরু করে। এর মধ্যে রাজধানীর সেগুনবাগিচা, উত্তরা, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও মিরপুর থেকে গত দুই দিনে দুই শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
জেলা পর্যায়ের নেতাদের ভাষ্যমতে, গত তিনদিন ধরে কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম, গোপালগঞ্জ, ফেনী, কুমিল্লা ও শরীয়তপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ, ডিবি ও অন্যান্য সংস্থার সদস্যরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছেন।
গোপালগঞ্জ জেলার যুবলীগের এক নেতা জানান, অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যরা রাতে ঘরের দরজায় টোকা দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের খোঁজে। জেলার পরিচিত নেতাকর্মীদের বাসায় কোনো কোনো সময় দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ঘরের ভেতর প্রবেশ করে তল্লাশি চালায়।
পুলিশ সদরদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দলটির ঝটিকা মিছিলের নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিদের খোঁজে অভিযান চলছে। কোথাও আবার ‘গোপন বৈঠক’ কিংবা ‘নাশকতার প্রস্তুতি’র তথ্যের ভিত্তিতে গভীর রাতে বাড়ি ঘিরে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
শরীয়তপুর জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) রওনক জাহান বলেন, ‘আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করার জন্য কোথাও কোনো নাশকতার পরিকল্পনা করা হচ্ছে কিনা এবং ওই দিন লোকজন জড়ো হয়ে জানমালের ক্ষতি করার কোনো ছক আছে কিনা—সেসব বিষয় মাথায় রেখেই পুলিশ কাজ করছে।’
অন্য এক পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্য, ২৩ জুনকে কেন্দ্র করে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। তবে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পরিবার ও স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সামনে রেখে আতঙ্ক তৈরি করতেই রাতের আঁধারে এভাবে বাড়ি বাড়ি অভিযান চালানো হচ্ছে।
রাজধানীতে গত ১৯ জুন উত্তরার জসীমউদ্দীন রোড এলাকায় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের ব্যানারে একটি ঝটিকা মিছিল বের হওয়ার পরই নড়েচড়ে বসে ঢাকা মহানগর পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ। মিছিলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর রাতেই শুরু হয় ধরপাকড় ও নজরদারি।
এরই ধারাবাহিকতায় পুরান ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে অভিযান চালায় গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল। ভোলাগামী একটি যাত্রীবাহী লঞ্চে তল্লাশি চালিয়ে উত্তরার ওই মিছিলের নেতৃত্ব দেওয়া দুই আওয়ামী লীগ নেতা মেহেদি হাসান ও শহীদুল্লাহকে আটক করা হয়। তারা গ্রেপ্তার এড়াতে নদীপথে ঢাকা ছাড়ার চেষ্টা করছিলেন।
এদিকে ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও মিরপুরের একাধিক নেতার বাসাতেও গভীর রাতে তল্লাশি চালানো হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়া এলাকায় শুক্রবার (১৯ জুন) রাত সাড়ে আটটার দিকে আরেকটি বড় অভিযান শুরু হয়। জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও কুষ্টিয়া পৌরসভার সাবেক মেয়র আনোয়ার আলীর বাড়ি ঘিরে ফেলে পুলিশ, র্যাব ও ডিবির সদস্যরা। প্রায় ১০-১২টি গাড়িতে আসা অর্ধশতাধিক সদস্য বাড়ির প্রতিটি কক্ষ, ছাদ ও আশপাশের এলাকায় তল্লাশি চালান।
কুষ্টিয়া মডেল থানার ওসি কবির হোসেন মাতুব্বর জানান, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ওই বাড়িতে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠনের সদস্যদের বৈঠকের খবর পেয়ে অভিযান চালানো হয়। তবে প্রায় চার ঘণ্টার তল্লাশির পরও কাউকে আটক করা যায়নি। পরিবারের অভিযোগ, এটি ছিল রাজনৈতিক হয়রানিমূলক অভিযান।
চট্টগ্রাম, গোপালগঞ্জ ও সীমান্ত জেলায় বাড়তি সতর্কতা
চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালি, চকবাজার ও বাকলিয়া এলাকায় গত ২৪ ঘণ্টায় মেস, আবাসিক হোটেল এবং আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজনদের স্বজনদের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কয়েকজনকে আটকও করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে সম্ভাব্য সংঘাত ঠেকাতে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত গোপালগঞ্জের সদর, কোটালীপাড়া ও টুঙ্গিপাড়ায় সবচেয়ে বেশি পুলিশি তৎপরতা দেখা গেছে। সাম্প্রতিক ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় সন্দেহভাজনদের তালিকা ধরে বাড়ি বাড়ি অভিযান চলছে।
এছাড়া ফেনী, কুমিল্লা, যশোরসহ সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতেও জোরদার করা হয়েছে চেকপোস্ট ও তল্লাশি। সীমান্ত দিয়ে কোনো চিহ্নিত নেতা যাতে পালাতে না পারেন, সে জন্য বিজিবির পাশাপাশি পুলিশও নজরদারি বাড়িয়েছে। অতীতে বিভিন্ন মামলার আসামি বা নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছেন—এমন সন্দেহভাজনদের ধরতেই এই কড়াকড়ি বলে জানা গেছে।
যশোর জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘যশোর জেলার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে অন্যান্য জেলার চেয়ে ভিন্ন কৌশলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। কোনো রাজনৈতিক দল কর্মসূচির ঘোষণা দিয়ে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড করার সুযোগ পাবে না। একইসঙ্গে সীমান্ত পেরিয়ে কেউ যেন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে না পারে এবং এখান থেকে পালিয়ে যেতে না পারে, সে বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখছে জেলা পুলিশ। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে বিজিবির সঙ্গে সমন্বয় করে আগামী ২৩ জুনের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।’
পুলিশের বার্তা: রাজপথে নামতে দেওয়া হবে না
জেলা ও ঢাকা মহানগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২৩ জুনকে কেন্দ্র করে কোনো নিষিদ্ধ সংগঠনকে রাজপথে নামতে দেওয়া হবে না। জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার চেষ্টা বা নাশকতার আভাস পেলেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাষ্য, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই চিরুনি অভিযান ও বাড়ি বাড়ি তল্লাশি অব্যাহত থাকবে।
২৩ জুন সামনে রেখে দেশজুড়ে যে নিরাপত্তা বলয় তৈরি হয়েছে তাতে স্পষ্ট, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবার কেবল একটি রাজনৈতিক দিন নয়, বরং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় এক পরীক্ষার দিন হয়ে উঠছে।
