বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬
Logo
×
স্যাটেলাইট চিত্রে প্রমাণ

যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে গাজায় স্থায়ী দখলের পথে ইসরায়েল

প্রথম সমাচার ডেস্ক ০৩ জুন ২০২৬, ০৯:৫০ অপরাহ্ন

যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী গাজা থেকে ইসরায়েলি সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে ঘটছে সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অবরুদ্ধ এই ভূখণ্ডজুড়ে ইসরায়েলি বাহিনী নীরবে একের পর এক স্থায়ী ও সুরক্ষিত সামরিক ঘাঁটি গেড়ে বসছে।

মে ২০২৬ পর্যন্ত সংগ্রহ করা স্যাটেলাইট তথ্য বিশ্লেষণ করে গাজার অভ্যন্তরে মোট ৪০টি পৃথক ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটির অস্তিত্ব শনাক্ত করা হয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, এই ৪০টি ঘাঁটির মধ্যে আটটি সম্পূর্ণ নতুন — অর্থাৎ ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরে শূন্য থেকে নির্মাণ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে একটিতে এখনও নির্মাণকাজ চলছে বলে স্যাটেলাইট চিত্রে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। নতুন ঘাঁটিগুলো উত্তর গাজায় দুটি, নেৎজারিম করিডরের পূর্বে জুহর আল-দিক এলাকায় একটি, মধ্য গাজায় দুটি এবং খান ইউনিসে তিনটি।

কেবল নতুন নির্মাণই নয়, বিদ্যমান ঘাঁটিগুলোর ব্যাপক সম্প্রসারণও হচ্ছে। গাজা সিটির পূর্বাঞ্চলে একটি পুরনো সামরিক ঘাঁটির আয়তন অক্টোবর ২০২৫ থেকে মে ২০২৬-এর মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছে।

সেখানে এখন সাঁজোয়া যানবাহনের জন্য নতুন প্রস্তুতি ক্ষেত্র, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা কাঠামো এবং ব্যাপক অভ্যন্তরীণ পরিকাঠামো গড়ে উঠেছে। মধ্য গাজায় আরেকটি ঘাঁটির চারপাশে গভীর প্রতিরক্ষামূলক পরিখা খনন করা হচ্ছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এটি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অবস্থানে রূপান্তরিত হচ্ছে।

যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে যে “ইয়েলো লাইন” বা সীমারেখা নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেটিও ধীরে ধীরে স্থায়ী সামরিক সীমান্তে পরিণত হচ্ছে। উত্তরের বেইত লাহিয়া অঞ্চলে স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, নির্ধারিত সীমারেখা পেরিয়ে ফিলিস্তিনিদের বসবাসের জন্য চিহ্নিত এলাকায় ৫৮০ মিটারেরও বেশি ভেতরে মাটির দীর্ঘ বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর যানবাহনের চলাচলের চিহ্নও পাওয়া গেছে সেই সীমারেখার বাইরে।

এই মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে ইসরায়েলের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘোষণা পুরোপুরি মিলে যাচ্ছে। সম্প্রতি একটি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজার বৃহত্তর অংশ স্থায়ীভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার নির্দেশের কথা স্বীকার করেছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ ঘোষণা দিয়েছেন, ইসরায়েল কখনো গাজা ছেড়ে যাবে না এবং সেখানে সামরিক-কৃষি বসতি প্রতিষ্ঠা করা হবে।

এর আগে ২০২৫ সালের শেষ দিকে স্বাধীন গবেষণা সংস্থা ফরেনসিক আর্কিটেকচারের একটি তদন্তেও গাজায় ৪৮টি ইসরায়েলি সামরিক স্থাপনার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল, যার মধ্যে ১৩টি যুদ্ধবিরতির পরে নির্মিত। সেসব স্থাপনায় পাকা রাস্তা, ওয়াচটাওয়ার এবং ইসরায়েলের মূল সামরিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে স্থায়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।

এদিকে মানবিক বিপর্যয় ক্রমশ গভীর হচ্ছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত গাজায় নতুন করে ৭৫০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত এবং দুই হাজারের বেশি আহত হয়েছেন।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি অভিযানে এ পর্যন্ত মোট নিহতের সংখ্যা ৭২ হাজার ৩০০ ছাড়িয়েছে। চিকিৎসা সাময়িকী দ্য ল্যান্সেটের একটি স্বাধীন গবেষণার অনুমান অনুযায়ী প্রকৃত মৃতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

সূত্র: স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ (প্ল্যানেট ল্যাবস ও সেন্টিনেল হাব), ফরেনসিক আর্কিটেকচার এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম।

শেয়ার করুন:
লিঙ্ক কপি হয়েছে
Loading
আরও নিউজ লোড হচ্ছে...