দেশে ইন্টারনেটের ব্যান্ডউইথ নিয়ে এক ধরনের ‘জুজুর ভয়’ বা কৃত্রিম আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীদের একটি অংশ দাবি করছে, দেশ বড় ধরনের ব্যান্ডউইথ সংকটের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। যে কারণে ইন্টারনেটের দাম বৃদ্ধি ও গতির বিপর্যয় ঘটতে পারে। তবে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা এ দাবি সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়ে বলছে, দেশে ব্যান্ডউইথের কোনো সংকট নেই। ভবিষ্যতেও ঘাটতি হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। বাজার বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর আটকে থাকা বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল প্রকল্পের অনুমোদন পেতে এবং সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই বেসরকারি অংশীজনরা এ সংকটের জুজুর ভয় দেখাচ্ছেন। সরকার আশ্বস্ত করেছে যে গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেটের গতি কমা বা দাম বাড়ার কোনো কারণ এ মুহূর্তে নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে দেশে দুটি সাবমেরিন ক্যাবল সিস্টেমের সম্মিলিত সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার জিবিপিএস যা দেশের বর্তমান চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। ২০২৭ সালের মধ্যে বাস্তবায়নাধীন সি-মি-উই ৬ চালুর মাধ্যমে বিএসসিপিএলসি (বাংলাদেশ সাব মেরিন ক্যাবল কোম্পানি লিমিটেড)-এর সক্ষমতা ৩৪ হাজার জিবিপিএসে উন্নীত হবে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) হিসেবে, ২০৩০ সাল নাগাদ দেশে ব্যান্ডউইডথের জাতীয় চাহিদা হতে পারে ৩০ হাজার জিবিপিএস। বিপরীতে ২০২৭ সালের মধ্যেই সরকারি সাবমেরিন ক্যাবল ও আন্তর্জাতিক টেরেস্ট্রিয়াল ক্যাবলের (আইটিসি) সম্মিলিত সক্ষমতা ৪১ হাজার জিবিপিএস ছাড়িয়ে যাবে।
তবে দেশে ব্যান্ডউইডথের সংকট দেখা যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবাদাতাদের সংগঠন ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) সভাপতি ও আম্বার আইটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম। তিনি বলেন, প্রাইভেট সাবমেরিন ক্যাবলে সংযুক্ত হলে দেশের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত হবে। ইন্টারনেটের দাম ৫০ শতাংশ কমে যাবে। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সংযোগের মূল ভরসা বর্তমানে দুটি সরকারি সাবমেরিন ক্যাবল- সি-মি-উই-৪ ও সি-মি-উই-৫। এগুলোর সক্ষমতা যথাক্রমে ৪ দশমিক ৬ ও ২ দশমিক ৫ টেরাবিট। অবশিষ্ট ব্যান্ডউইডথ আইটিসির মাধ্যমে আমদানি করা হয়। তিনি বলেন, ঝুঁকি আরও বাড়ছে দুটি ক্যাবলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতায়। ভারত যেখানে ১৯টি, মালয়েশিয়া ২৩টি, থাইল্যান্ড ১২টি এবং ফিলিপাইন ১৯টি আন্তর্জাতিক সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে যুক্ত, সেখানে বাংলাদেশের রয়েছে মাত্র দুটি। কোনো একটি ক্যাবলে ত্রুটি বা রক্ষণাবেক্ষণজনিত সমস্যা হলে জাতীয় পর্যায়ে ইন্টারনেট সেবায় বড় চাপ তৈরি হতে পারে। তার এ মন্তব্যের জের ধরে যোগাযোগ করা হয় ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম ও প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি ও টেলিকম উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ-এর সঙ্গে। ভবিষ্যতে দেশে ব্যান্ডউইডথ সংকট হতে পারে বা ইন্টারনেটের দাম বাড়তে পারে-বেসরকারি খাতের এমন প্রচারণাকে মন্ত্রী সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছেন।
তিনি জানান, দেশে ব্যান্ডউইডথের কোনো ঘাটতি হবে না। ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে সরকারের তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবলটি ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে চালু করার লক্ষ্য রয়েছে। এটি চালু হলে দেশের সরকারি সক্ষমতা দাঁড়াবে ৪৩ টেরাবাইটে যা আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের চাহিদা মেটাতে সক্ষম। বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল কনসোর্টিয়ামের লাইসেন্স প্রসঙ্গে তিনি জানান, মন্ত্রণালয়ের কোনো প্রকার পূর্বানুমোদন ছাড়া আলাদাভাবে লাইসেন্সপ্রাপ্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথভাবে কনসোর্টিয়াম গঠন করার আইনি সুযোগ নেই। স্বতন্ত্র লাইসেন্সধারী কোম্পানিগুলোকে আইন মেনেই কাজ করতে হবে। একই প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি ও টেলিকম উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ জানান, দেশের ক্রমবর্ধমান ডেটা চাহিদা মেটাতে সাবমেরিন ক্যাবলের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। শহরের পাশাপাশি গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে উন্নত, নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দিতে সরকার কাজ করছে। ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব ও নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
দেশে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথের কোনো সংকট নেই এবং ভবিষ্যতেও ঘাটতির আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছে বিএসসিপিএলসি। একই সঙ্গে ব্যান্ডউইডথ সংকটের কারণে ইন্টারনেটের দাম বাড়ার আশঙ্কা বাস্তবতা বিবর্জিত, বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করা হয়েছে। সম্প্রতি গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা বলা হয়।
