বগুড়া সদর উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আম পেড়ে খাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিন শিক্ষার্থীকে অপমানজনক শাস্তি দেওয়ার অভিযোগে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন প্রধান শিক্ষক। বিদ্যালয়ের গাছ থেকে আম খাওয়ার ‘অপরাধে’ শিশুদের বেত্রাঘাতের পাশাপাশি স্যান্ডেল দিয়ে তৈরি মালা গলায় পরিয়ে বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষে ঘোরানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনাটি ঘটেছে সদর উপজেলার বুজর্গধামা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে থাকা আমগাছ থেকে কয়েকজন শিক্ষার্থী কিছু আম পেড়ে খায়। বিষয়টি জানার পর পরদিন প্রধান শিক্ষক গোল সাহানারা বেগম অভিযুক্ত তিন শিক্ষার্থীকে আলাদাভাবে ডেকে নেন।
অভিযোগ রয়েছে, প্রথমে তাদের বেত দিয়ে মারধর করা হয়। এরপর নিজের পায়ের স্যান্ডেল খুলে তা মালার মতো গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হয় এবং ‘আমচোর’ বলে চিহ্নিত করে এক শ্রেণিকক্ষ থেকে আরেক শ্রেণিকক্ষে ঘুরিয়ে দেখানো হয়। এ সময় শিশুরা ভয়ে কাঁদছিল বলে জানিয়েছে সহপাঠীরা।
ঘটনার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে অভিভাবক ও এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। অনেকেই বলেন, শিশুদের ভুলত্রুটি শাসনের মাধ্যমে সংশোধন করা যেতে পারে, কিন্তু প্রকাশ্যে অপমান করে মানসিক আঘাত দেওয়া কোনো শিক্ষকের কাজ হতে পারে না। এতে শিশুদের মনে দীর্ঘস্থায়ী ভয় ও হীনমন্যতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয়দের চাপের মুখে শনিবার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে প্রধান শিক্ষক শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং এলাকাবাসীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তবে ক্ষমা চাওয়ার পরও ক্ষোভ কমেনি। এলাকাবাসীর দাবি, শুধু মৌখিক দুঃখপ্রকাশ নয়—এ ধরনের আচরণের বিরুদ্ধে প্রশাসনিকভাবে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে কোনো শিক্ষক শিশুদের সঙ্গে এমন অপমানজনক আচরণ করতে সাহস না পান।
বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকও অনানুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন, ঘটনাটি জানার পর তারা প্রধান শিক্ষককে এমন শাস্তি না দিতে অনুরোধ করেছিলেন। পরবর্তীতে বিষয়টি বড় আকার ধারণ করলে তিনিও নিজের ভুল স্বীকার করেন।
শিক্ষার্থীদের বক্তব্য অনুযায়ী, শারীরিক শাস্তির চেয়েও সবার সামনে স্যান্ডেলের মালা গলায় ঝুলিয়ে ঘোরানো তাদের জন্য বেশি লজ্জা ও কষ্টের ছিল। তারা কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানিয়েছে, ওই ঘটনার পর বিদ্যালয়ে আসতেও ভয় লাগছিল।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা গোলাম কবীর বলেছেন, শিশুদের একটি সাধারণ ভুলের জন্য এমন অপমানজনক আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়েছে।
শিশুদের বিদ্যালয় হওয়া উচিত নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও শিক্ষার জায়গা। সেখানে যদি শাসনের নামে অপমান আর মানসিক নির্যাতন নেমে আসে, তাহলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তার মানবিক চরিত্র হারায়। বগুড়ার এই ঘটনা তাই শুধু একটি স্কুলের নয়, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মনস্তত্ত্ব নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
