ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, ফেরাউন ছিল মিসরের রাজা। তবে এটাও জেনে রাখা উচিত, ‘ফেরাউন’ কোনো ব্যক্তির নাম নয়। এটি তত্কালীন মিসরের সম্রাটদের উপাধি। কিবতি বংশীয় এই সম্রাটরা কয়েক শতাব্দীব্যাপী মিসর শাসন করেছেন। এ সময় মিসর সভ্যতা-সমৃদ্ধির শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছিল। লাশ মমি করা, পিরামিড তৈরি প্রভৃতি তাদের সময়কার বৈজ্ঞানিক উন্নতির প্রমাণ বহন করে। মুসা (আ.)-এর সময় পরপর দুজন ফেরাউন ছিল। লুইস গোল্ডিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, জালিম ফেরাউনের নাম ছিল দ্বিতীয় রামাসিস। আর ডুবে মরা ফেরাউন ছিল তার পুত্র মানেপতাহ বা মারনেপতাহ। লোহিত সাগরসংলগ্ন তিক্ত হ্রদে সে সসৈন্যে ডুবে মারা যায়। যার মমি ১৯০৭ সালে আবিষ্কৃত হয়। সিনাই উপদ্বীপের পশ্চিম তীরে ‘জাবালে ফেরাউন’ নামে একটি ছোট পাহাড় আছে। এখানেই ফেরাউনের লাশ সর্বপ্রথম পাওয়া যায় বলে জনশ্রুতি আছে।
যাই হোক, একবার ফেরাউন একদা স্বপ্নে দেখেন যে, বায়তুল মুক্বাদ্দাসের দিক থেকে একটি আগুন এসে মিসরের ঘর-বাড়ি ও মূল অধিবাসী কিবতিদের জ্বালিয়ে দিচ্ছে। অথচ অভিবাসী বনু ইসরাঈলদের কিছুই হচ্ছে না। ভীত-চকিত অবস্থায় তিনি ঘুম থেকে জেগে উঠলেন। অতঃপর দেশের বড় বড় জ্যোতিষী ও জাদুকরদের সমবেত করলেন এবং তাদের সম্মুখে স্বপ্নের বৃত্তান্ত বর্ণনা দিলেন ও এর ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন। জ্যোতিষীগণ বলল যে, অতি সত্বর বনু ইসরাঈলের মধ্যে একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করবে। যার হাতে মিসরীয়দের ধ্বংস নেমে আসবে’।
মিসর সম্রাট ফেরাউন জ্যোতিষীদের মাধ্যমে যখন জানতে পারলেন যে, অতি সত্বর ইসরাঈল বংশে এমন একটা পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করবে, যে তার সাম্রাজ্যের পতন ঘটাবে। তখন উক্ত সন্তানের জন্ম রোধের কৌশল হিসাবে ফেরাউন বনু ইসরাঈলদের ঘরে নবজাত সকল পুত্র সন্তানকে ব্যাপকহারে হত্যার নির্দেশ দিল। উদ্দেশ্য ছিল, এভাবে হত্যা করতে থাকলে এক সময় বনু ইসরাঈল কওম যুবক শূন্য হয়ে যাবে। বৃদ্ধরাও মারা যাবে। মহিলারা সব দাসীবৃত্তিতে বাধ্য হবে। অথচ বনু ইসরাঈলগণ ছিল মিসরের শাসক শ্রেণী এবং উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন জাতি। এই দূরদর্শী কপট পরিকল্পনা নিয়ে ফেরাউন ও তার মন্ত্রীগণ সারা দেশে একদল ধাত্রী মহিলা ও ছুরিধারী জল্লাদ নিয়োগ করে। মহিলারা বাড়ী বাড়ী গিয়ে বনু ইসরাঈলের গর্ভবতী মহিলাদের তালিকা করত এবং প্রসবের দিন হাযির হয়ে দেখত, ছেলে না মেয়ে। ছেলে হলে পুরুষ জল্লাদকে খবর দিত। সে এসে ছুরি দিয়ে মায়ের সামনে সন্তানকে জবাই করে ফেলে রেখে চলে যেত। এভাবে বনু ইসরাঈলের ঘরে ঘরে কান্নার রোল পড়ে যেত। ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, একাধিক মুফাসসির বলেছেন যে, শাসকদল ক্বিবতিরা ফেরাউনের কাছে গিয়ে অভিযোগ করল যে, এভাবে পুত্র সন্তান হত্যা করায় বনি ইসরাঈলের কর্মজীবী ও শ্রমিক শ্রেণীর ঘাটতি হচ্ছে। যাতে তাদের কর্মী সংকট দেখা দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে ফেরাউনের সেই বীভত্স রাজনীতির কথা উল্লেখ রয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘এবং (সেই সময়কেও স্মরণ কর), যখন আমি তোমাদেরকে ফিরাউনের লোকজন থেকে মুক্তি দেই, যারা তোমাদেরকে কঠিন শাস্তি দিচ্ছিল। তোমাদের পুত্রদেরকে জবাই করে ফেলছিল এবং তোমাদের নারীদেরকে জীবিত রাখছিল। আর এই যাবতীয় পরিস্থিতিতে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য ছিল মহা পরীক্ষা।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ৪৯)
কোরআনে বর্ণিত এই ঘটনাটি আমাদের সামনে কয়েকটি গভীর বাস্তবতা উন্মোচন করে; এক. স্বৈরশাসন টিকিয়ে রাখতে শাসকরা ভবিষ্যত্ প্রজন্মকেও ধ্বংস করতে দ্বিধা করে না। দুই. নিরপরাধ মানুষের রক্তের উপর প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতা কখনো স্থায়ী হয় না। এবং তিন. আল্লাহর বিচার অবশ্যম্ভাবী, জুলুম যত বড়ই হোক, তার পরিণাম অনিবার্য।
সুতরাং কোরআনের এই ঘটনাগুলো থেকে আমাদের সবার শিক্ষা নেওয়া উচিত।
