বাংলাদেশের গ্রাম থেকে শুরু করে শহরের আকাশ—সব জায়গাতেই ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে কাকের উপস্থিতি। একসময় ভোরের নীরবতা ভাঙত কাকের ডাক, আর বিকেলের আকাশ ভরে উঠত ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে যাওয়া কাকের দৃশ্যে। কিন্তু এখন সেই পরিচিত চিত্র অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে কাকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করছেন পরিবেশবিদরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত নগরায়ণ কাকের আবাসস্থল ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ। শহরে পুরনো বড় গাছ কেটে ফেলা, উঁচু ভবনের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং খোলা জায়গা কমে যাওয়ায় কাকের বাসা বাঁধার সুযোগ কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে আগের মতো উন্মুক্ত খাবারের উৎসও আর সহজলভ্য নয়। ফলে খাদ্য সংকটও কাকের সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
গ্রামাঞ্চলেও পরিস্থিতি বদলেছে। কৃষিকাজে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার খাদ্যচক্রে প্রভাব ফেলছে। ধান মাড়াই, গৃহপালিত পশুর অবশিষ্ট খাবার কিংবা খোলা পরিবেশে ফেলে রাখা খাদ্যের পরিমাণ কমে যাওয়ায় কাকের খাদ্য সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে পরিবেশ দূষণ এবং সম্ভাব্য রোগবালাইও এ পাখির মৃত্যুহার বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, কাক প্রকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে ভূমিকা রাখে। মৃত প্রাণী ও পচনশীল বর্জ্য খেয়ে তারা একধরনের প্রাকৃতিক পরিষ্কারক হিসেবে কাজ করে। ফলে কাকের সংখ্যা কমে গেলে পরিবেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
গবেষকদের মতে, কাকের এই কমে যাওয়া একটি সতর্ক সংকেত, যা পরিবেশগত ভারসাম্যের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। শুধু কাক নয়, অন্যান্য সাধারণ পাখির সংখ্যাও কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা জীববৈচিত্র্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি তৈরি করতে পারে।
পরিবেশবিদরা মনে করছেন, এখনই গাছপালা সংরক্ষণ, কীটনাশকের ব্যবহার কমানো এবং পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। কাকের সংখ্যা কমে যাওয়ার এই প্রবণতা তাই শুধু একটি প্রজাতির সংকট নয়, বরং দেশের সামগ্রিক পরিবেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
