জ্বালানি সংকট অব্যাহত থাকলে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় লোডশেডিং আরও বাড়বে বলে আভাস দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। উৎপাদন সক্ষম বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেও প্রয়োজনীয় গ্যাস, কয়লা ও এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। ফলে গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুৎ ঘাটতি আরও তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের সর্বশেষ হিসাব ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা, ডলারের উচ্চমূল্য এবং আমদানিনির্ভরতা সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়া এবং ব্যয়বহুল জ্বালানি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক কেন্দ্র সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছে না।
পাওয়ার গ্রিড অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে কয়েক হাজার মেগাওয়াটের ব্যবধান তৈরি হচ্ছে, যা লোডশেডিং আকারে গ্রাহকের ওপর পড়ছে। বিদ্যুৎ বিভাগও স্বীকার করেছে, এই ঘাটতি সামনের দিনে আরও বাড়তে পারে।
দেশে উৎপাদন সক্ষম বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেও প্রয়োজনীয় জ¦ালানির অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে না। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মপরিকল্পনা এবং সামনের দিনগুলোয় জ¦ালানি আমদানি পরিকল্পনা পর্যালোচনা করলে এমনই আভাস পাওয়া যায়। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে জ¦ালানি তেল আমদানি, কয়লা আমদানি, এমনকি এলএনজি আমদানিতে সংকট রয়েছে। ফলে গ্রীষ্মে লোডশেডিং দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে সরকার।
গতকাল বিকাল ৫টায় পাওয়ার গ্রিড অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যানুযায়ী বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ২১৮ মেগাওয়াট, উৎপাদন ও সরবরাহ হয়েছে ১২ হাজার ৮৬৬ মেগাওয়াট। ফলে লোডশেডিং হয়েছে দুই হাজার ৩৫২ মেগাওয়াট। পিজিসিবির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, উৎপাদন মূলত বিতরণ কোম্পানিগুলোর চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ঠিক করে। পিডিবির চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে জেনারেশন বা উৎপাদন কোম্পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।
ইরান যুদ্ধই কি জ¦ালানি আমদানিতে সংকট? ইরান যুদ্ধের কারণে জ¦ালানি পণ্য বিশেষ করে জ¦ালানি তেল, কয়লা, এলএনজি, আমদানি কিছু সংকট তৈরি হলেও দেশের আর্থিক সংকট বড় কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। যুদ্ধবিরতির পর সরকার তার নিয়মিত উৎস থেকে
যে জ¦ালানি তেল আমদানি করত, এখন বিকল্প একাধিক উৎস থেকে জ¦ালানি আমদানি করছে। সেক্ষেত্রে উন্মুক্ত দরপত্র বা জিটুজি চুক্তির মাধ্যমে আমদানির চেয়ে অনেক বেশি মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ আমদানির যে পরিকল্পনা করেছে তাতে দেখা যায়, ১৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী বিদ্যুৎ আমদানি ও সরবরাহ করতে হলে সরকারের যে পরিমাণ অর্থ সংস্থান করতে হবে সেখানে নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হবে। ফলে এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা ছোট করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যয়বহুল জ¦ালানির কারণে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো কম চালানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য কিছু গ্যাসভিত্তিক এবং সক্ষমতার পুরোটা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে যাওয়া।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, গ্রামে ও শহরে লোডশেডিং দিয়েই বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। অর্থাৎ গ্রীষ্মকালীন সময়ে লোডশেডিংমুক্ত রাখার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নাই।
বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম সচিব জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সর্বোচ্চ চাহিদা ধরা হয় ১৭ হাজার মেগাওয়াট। একই সময়ে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হতে পারে। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি হতে পারে ৩ হাজার মেগাওয়াট। এ ঘাটতি পূরণে লোডশেডিংয়ের কোনো বিকল্প নেই।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বিদ্যুৎ বিভাগ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গত বুধবার বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৭৬৭ মেগাওয়াট। সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৬৮১ মেগাওয়াট। তার মানে, ২ হাজার ৮৬ মেগাওয়াটের মতো লোডশেডিং হয়েছিল।
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, গ্রাম ও শহরের মধ্যে লোডশেডিং সমন্বয় করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যেন সেচ কার্যক্রম ব্যাহত না হয়। এ ছাড়া ভারসাম্য বজায় রেখে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। তবে ঢাকা শহর লোডশেডিংমুক্ত রাখা হয়েছে।
গত ২১ এপ্রিল অর্থ মন্ত্রণালয় বিদ্যুৎ বিভাগের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২ হাজার ৬৭ কোটি ৫ লাখ টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ দিয়েছে। এ ভর্তুকি পিডিবির ইচ্ছামতো খরচ করার ক্ষেত্রে রাশ টানা হয়েছে। ভর্তুকির টাকা বরাদ্দের পাশাপাশি শুধুমাত্র বেসরকারি খাতের রেন্টাল ও আইপিপি (ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার) বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য বরাদ্দ দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বা বিদ্যুৎ বিভাগ আগে নিজেদের মতো করে যে অর্থ পরিশোধ করত সেটা বন্ধ করে দিয়ে বলা হয়েছে এক খাতের বা কেন্দ্রের ভর্তুকি অন্য খাতে স্থানান্তর করা যাবে না।
এদিকে বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, এমনিতেই আর্থিক সংকটের মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। বিশাল ভর্তুকির বোঝা ঘাড়ে। সেখানে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি পায়রা, রামপাল ও পটুয়াখালী তিনটি বড় কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে আইনি জটিলতায় ভর্তুকি দেওয়া যাবে না এমন শর্ত দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি বা উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির অনুমোদন না থাকায় এ দুই কেন্দ্রের ভর্তুকি বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যবস্থায় সংকট তৈরি হবে।
কয়লাভিত্তিক পটুয়াখালীর (আরপিসিএল-নরিনকো) ১ হাজার ২৪৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ফার্নেস অয়েলচালিত বিআর-পাওয়ার জোন ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ভর্তুকি চাওয়া হলেও তা অনুমোদন করেনি অর্থ মন্ত্রণালয়। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। কয়লা সংকটে পটুয়াখালীর বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মাত্র ২৫০ থেকে ৩৫০ মেগাওয়াট চলছে। অর্ন্তবর্তী সরকারের সময় কয়লা আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা জটিলতা তৈরি করায় বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি কয়লা আমদানি করতে পারেনি। ওই নির্দেশনায় ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে ভর্তুকি দেওয়া যাবে না বলেও শর্ত দেওয়া হয়। তবে বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবাহের স্বার্থে নিশ্চয়ই এসব জটিলতা নিরসন করা হবে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) তাদের এক হিসাবে বলছে, চলতি বছরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর ১০ মাসে বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন খরচ এবং বিক্রয় দামের মধ্যে যে পার্থক্য তাতে প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকির মধ্যে পড়বে। সেই হিসাবও স্থির থাকবে না যদি ডলারের দাম বাড়ে বা জ¦ালানি পণ্যের দাম আরও বেড়ে যায়। একই সঙ্গে বাংলাদেশ তেল গ্যাস খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্রে জানা গেছে, যুদ্ধের কারণে কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে স্বাভাবিক হিসাবের চেয়ে তিন মাসে এলএনজি আমদানি করতে অতিরিক্ত খরচ বাড়বে ২০ হাজার কোটি টাকা। যদি এলএনজির দাম আরও বাড়ে সেই খরচ বা ভর্তুকির হিসাবও বাড়বে। অর্থাৎ এই যুদ্ধের কারণে জ¦ালানি আমাদনি করতে এক গভীর সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
দেশে প্রতিদিন প্রায় চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও দেশীয় উৎপাদন অনেক কম। এলএনজি থেকে ৯০০ মিলিয়ন থেকে এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের জোগান দেওয়া হয়। একটি এলএনজি কার্গো সরবরাহ দেরি হলেই দিনে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়। এই পরিস্থিতিতে সরকার ইতোমধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানায় গ্যাস রেশনিং শুরু করেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারির আগে এক কার্গো এলএনজি প্রায় তিন হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আমদানি করত, যেখানে ৫০০ কোটি টাকা খরচ হতো। সেই পরিমাণ এলএনজি এখন আমদানি করতে প্রায় ১২শ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে বলে জ¦ালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি ছিল প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৬ হাজার কোটি টাকা। বর্তমান পরিস্থিতিতে পিডিবি ধারণা করছে ভর্তুকির পরিমাণ হবে প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা হবে।
