মায়ের কোল থেকে শেষবার কবে নেমে গিয়েছি, মনে পড়ে না। শেষবার কখন মায়ের কোলে শুয়েছি, তাও মনে পড়ে না। যখন আমি খুব ছোট, মায়ের তখনকার চেহারাটা মনে করার চেষ্টা করি—মনে পড়ে না। যখন কৈশোরে আসি, আমাদের মায়ের বয়স আরেকটু বাড়ে; মায়ের তখনকার চেহারাটা খুব মনে পড়ে।
তারপর আমি যখন আরও বড় হই, মা তখন ধীরে ধীরে আমাদের চোখের সামনে দিয়ে বয়সের সঙ্গে হেঁটে হেঁটে বয়স্ক হয়ে যান। মায়ের এমন অসহায় বার্ধক্যের চেহারা আমাকে খুব কষ্ট দেয়। মায়ের বয়স্ক আঙুলগুলো আমাদের ভালোবাসার স্পর্শ খোঁজে। সন্তানের জন্য কত রাত জাগা, সংসারের জন্য কত পরিশ্রম করা—একজন জীবনযোদ্ধার এমন অসহায় রূপ আমাকে খুব কষ্ট দেয়। নিজের কাজগুলোই এখন আর করতে পারেন না।
আচ্ছা, ছোটবেলায় মা আমাদের কাজগুলো যেভাবে করে দিতেন, আমরা কি পারি না বড় হয়ে মায়ের কাজগুলো সেভাবে করে দিতে? মাঝে মাঝে নিজেকেই প্রশ্ন করি—মায়ের ভালোবাসা যদি হয় আকাশসমান, সন্তানের ভালোবাসাটা সেই আকাশের একটা তারাও কেন হয় না? নিজেই আবার উত্তর দিই—আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো যেমন আমাদের অংশ, তেমনি আমরাও আমাদের মায়ের অংশ। মা তো আর আমাদের অংশ নন, তাই হয়তো আমরা মাকে নিয়ে এতটা চিন্তা করি না।
গাছেরা যেমন বড় হতে হতে মাটি থেকে দূরে সরে যায়—শাখা-ডালপালা মেলে প্রশস্ত আকাশের নিচে; আমরাও বড় হতে হতে মায়ের থেকে দূরে চলে যাই।
যখন আমি আমার ছোট্ট মেয়েটার দিকে তাকাই, মাকে ভীষণভাবে অনুভব করি। আমার মেয়ের সারাক্ষণ আমাকে চাই। আমি ছাড়া তার এত আপন আর কেউ নেই। আমাকে ঘিরেই তার পৃথিবী এখন। আমার পৃথিবীটাও একসময় মাকে ঘিরেই ছিল। ধীরে ধীরে বড় হই। আমাদের পৃথিবীতে অনেক মানুষ আসে; মায়ের জন্য সময়টা কমে যায়। আমাদের চিন্তার জগতে মায়ের পাশে আরও অনেক চিন্তা এসে যোগ হয়।
মায়ের সঙ্গে ঘুমাতে পারি না; কখনো ঘুমালেও এখন ছোটবেলার মতো জড়িয়ে ধরি না—কারণ এখন যে অনেক বড় হয়ে গেছি। লম্বায় মাকে ছাড়িয়ে গেছি! ব্যস্ত এই সময়গুলোতে জীবিকা, জীবন, সংসার নিয়ে এতটাই ব্যস্ত থাকি যে প্রতিদিন নিয়ম করে মায়ের খোঁজ নিতে পারি না। মা কী খেয়েছেন, মায়ের মন ভালো আছে কি না—এটুকু জিজ্ঞেস করার সময়টাও মাঝেমধ্যে হয়ে ওঠে না।
তবু হঠাৎ যখন বৃষ্টি নামে, খুব ইচ্ছে জাগে—ঝাপসা শহর পেছনে ফেলে শক্ত করে জড়িয়ে ধরি মাকে। মায়ের সামনে বসে একে একে খুলে ফেলি আমার জড়তা, আড়ষ্টতা—আমার বড় হয়ে ওঠা সবকিছু। সব এনে জমা করি মায়ের পায়ের কাছে। মায়ের সামনে বসে ছোটবেলায় ফিরে যেতে খুব, খুব ইচ্ছে করে।
ছোটবেলা থেকে একটা প্রশ্ন শুনে এসেছি—“বড় হয়ে তুমি কী হতে চাও?” ছোটবেলার উত্তরটা এখন পাল্টে গেছে। এখন কেউ জিজ্ঞেস করলে বলব—
বড় হয়ে আমি আবার ছোট হতে চাই।
মায়ের কোলে শুয়ে গল্প শুনতে চাই।
কিন্তু গল্প কি আর শোনা হবে?
পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে দিন দিন। মনের ভেতরেও এখন খুব গরম। মায়ের জন্য ভালোবাসার ফুলটাও যেন সেই গরমে বিমর্ষ হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। মাঝে মাঝে কিছু বরফ-ঠান্ডা পানিতে ফুলগুলোকে গোসল করাতে হবে—তবেই না স্নিগ্ধ হবে মায়ের জন্য রাখা ভালোবাসার ফুল।
মাকে জড়িয়ে ধরে বলতে ইচ্ছে করছে এই মুহূর্তে—
“মা, তোমাকে অনেক ভালোবাসি।”
ওই যে, অনেক বড় হয়ে গেছি—সেই জন্য হয়তো সামনাসামনি বলা হয় না।
আমাদের মা যেন আমাদের পৃথিবীর আলো হয়ে থাকেন আরও অনেক বছর। আমাদের মা ভালো থাকুন। আমরা যেন ভালো রাখতে পারি মাকে। আমাদের কথা ও কাজে যেন কোনো কষ্ট না পান মা।
লেখক: জান্নাতুল আলা, কলেজ শিক্ষক ও লেখক।
