তুরস্কের সিলিফকে (Silifke)—মেরসিন অঞ্চলের অন্যতম সুন্দর ও আকর্ষণীয় একটি শহর। একদিকে নীল ভূমধ্য সাগর (Mediterranean Sea), অন্যদিকে সবুজে ঘেরা পাহাড়; মাঝখানে কখনো উঁচুনিচু, কখনো সমতল ভূমি—প্রকৃতি যেন নিজ হাতে এঁকেছে সিলিফকের ছবি। ইতিহাস, ঐতিহ্য আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মেলবন্ধনে জায়গাটি যে কাউকে মুগ্ধ করতে বাধ্য।
সিলিফকে আমি এর আগেও কয়েকবার গিয়েছি। তবে এবারের ভ্রমণ ছিল একটু ভিন্ন। শেষবার গিয়েছিলাম তাশুজু (Taşucu) সমুদ্রবিচে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক দড়ি টানাটানি প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে। শুরুতে ভেবেছিলাম, এটি হয়তো স্থানীয় বা প্রবাসীদের অংশগ্রহণে আয়োজন করা একটি সাধারণ প্রতিযোগিতা। সেই ভাবনা থেকেই বাংলাদেশের একটি দল গঠন করেছিলাম—যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ভ্রমণ আর বিনোদন, জয়-পরাজয় নয়।
বাংলাদেশি মোহাম্মদ ইব্রাহিম, আকাশসহ ছয়জনের একটি দল নিয়ে আমরা সকালে পৌঁছে যাই। খেলোয়াড় সংকটের কারণে আমাদের দলে পাকিস্তান, ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের একজনকেও যুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু সেখানে গিয়ে যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলাম, তা একেবারেই ভিন্ন। সমুদ্রের বালুচরে বিশাল আয়োজন, আন্তর্জাতিক মানের পরিবেশ, আর বিশ্বের নানা দেশ থেকে আসা পেশাদার খেলোয়াড়—সব মিলিয়ে আমরা সত্যিই অবাক হয়ে গেলাম।
আমরা যেটা ভেবেছিলাম, বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বেশি বড়। প্রতিটি দলই এসেছিল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে। যদিও আমাদের মতো কিছু দল ছিল, যারা কেবল অংশগ্রহণ আর অভিজ্ঞতার জন্য এসেছে। খেলার ফলাফল আমাদের পক্ষে যায়নি—প্রায় সব ম্যাচেই হেরেছি। কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়। সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল, “বাংলাদেশ” নামটি বারবার উচ্চারিত হয়েছে, দর্শকদের অনেকেই প্রথমবারের মতো আমাদের দেশ সম্পর্কে জেনেছেন।
খেলা শেষে শুরু হয় ভ্রমণের আরেক অধ্যায়। পুরো সমুদ্রবিচ ঘুরে দেখা, সাগরের পানিতে নেমে সাঁতার কাটা, বালুর ওপর হাঁটা—সবকিছু যেন এক অন্যরকম প্রশান্তি এনে দেয়। একপাশে সাগর, অন্যপাশে পাহাড়—দৃশ্যটা যেন জীবন্ত কোনো চিত্রকর্ম। কাছেই ছিল আরামদায়ক হোটেল, দূরে নোঙর করা জাহাজ, আর চারপাশে পর্যটকদের ভিড়।
বিকেলের দিকে সূর্য যখন ধীরে ধীরে সাগরের বুকে ডুবে যাচ্ছিল, সেই দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। মনে হচ্ছিল সময়টা থেমে যাক। চারপাশে বিভিন্ন দেশের মানুষ, তাদের ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন ভাষা—সব মিলিয়ে এক অসাধারণ বৈচিত্র্য।
রাত নামলে আমরা একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করলাম, কিছুক্ষণ আড্ডা আর হালকা খেলাধুলা। তারপর ধীরে ধীরে সবাই নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে গেলাম।
ফিরে আসার পরও মনে হয়—শরীরটা হয়তো ফিরে এসেছে, কিন্তু মনটা যেন এখনো পড়ে আছে সেই সিলিফকের সমুদ্রতীরে। চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে সেই নীল জল, সোনালি বালু আর দড়ি টানাটানির উত্তেজনায় ভরা দিনটি। মনে মনে শুধু একটা কথাই আসে—
জীবনটাকে যদি এমন মুহূর্তেই আটকে রাখা যেত!
