সারাদেশ যখন তীব্র গরমে অস্থির, দিনাজপুরের গাবুরা বাজার তখন টমেটোর টকটকে লাল রঙে রঙিন। শীতকালীন সবজি হিসেবে পরিচিত হলেও এখন গ্রীষ্মকালীন টমেটোর হাত ধরে বদলে যাচ্ছে উত্তরের অর্থনীতি। দিনাজপুরের সদর উপজেলার গাবুরা বাজার এখন উত্তরবঙ্গের গ্রীষ্মকালীন টমেটোর বৃহত্তম বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এখান থেকেই প্রতিদিন প্রায় ৬০ থেকে ৭০ ট্রাক টমেটো পৌঁছে যাচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
দৈনিক কেনাবেচা ৩ থেকে ৪ কোটি টাকা গাবুরা বাজারে ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত চলে ক্রেতা-বিক্রেতাদের অবিরাম ব্যস্ততা। স্থানীয় আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, এই হাটে প্রতিদিন গড়ে ৩ থেকে ৪ কোটি টাকার টমেটো কেনাবেচা হচ্ছে। ছোট-বড় ৪০০টিরও বেশি ঘর বা আড়ত নিয়ে গড়ে ওঠা এই বাজারে কাজ করছেন হাজারো শ্রমিক। শুধু আড়তদার নয়, টমেটো বাছাই, মোড়কজাত করা এবং ট্রাক লোডিংয়ের কাজে যুক্ত হয়ে বাড়তি আয় করছেন স্থানীয় কয়েকশ শিক্ষার্থীও।
কৃষকের মুখে হাসি, লাভের অঙ্ক কয়েক গুণ এবার বৃষ্টির কারণে উৎপাদন কিছুটা কম হলেও বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় খুশি চাষিরা। মানভেদে প্রতি মণ টমেটো ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
-
সফলতার চিত্র: স্থানীয় কৃষক আরাফাত হোসেন জানান, মাত্র আধা বিঘা জমিতে ৩০ হাজার টাকা খরচ করে তিনি ১ লাখ ৭০ হাজার টাকার টমেটো বিক্রি করেছেন।
-
হিসাব-নিকাশ: কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, প্রতি বিঘায় চাষাবাদে খরচ হয় ৭০-৮০ হাজার টাকা। বিপরীতে উৎপাদিত টমেটো বিক্রি করে ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব হচ্ছে।
পাইকারি বাজার ও আড়তদারদের ভাষ্য সারা দেশ থেকে আসা প্রায় তিন শতাধিক পাইকার প্রতিদিন এই বাজার থেকে টমেটো সংগ্রহ করেন। রাজবাড়ী থেকে আসা ব্যবসায়ী শফি উদ্দিন জানান, সিলেট, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে সরবরাহের জন্য তিনি এখান থেকেই প্রধানত টমেটো কেনেন। তবে পচনশীল পণ্য হওয়ায় পাইকার ও আড়তদারেরা বলছেন, বর্তমানে সীমিত লাভেই তাদের ব্যবসা করতে হচ্ছে। ঢাকার বাজারে এই টমেটো বর্তমানে ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
বাড়ছে আবাদের পরিধি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, দিনাজপুরে প্রতিবছরই গ্রীষ্মকালীন টমেটোর আবাদ বাড়ছে।
-
২০২৪-২৫ অর্থবছরে আবাদ হয়েছিল ৮৬৫ হেক্টর জমিতে।
-
চলতি মৌসুমে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১০৮ হেক্টরে। এক বছরের ব্যবধানে আবাদ বেড়েছে ২৪৩ হেক্টর জমিতে।
উন্নত সংরক্ষণের দাবি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আফজাল হোসেন জানান, এক সময় পঞ্চগড়ে গ্রীষ্মকালীন টমেটোর প্রাধান্য থাকলেও এখন দিনাজপুর তাকে ছাড়িয়ে গেছে। তিনি বলেন, “স্থানীয়ভাবে হিমাগার বা কোল্ড স্টোরেজ সুবিধা বাড়ানো গেলে কৃষকেরা আরও দীর্ঘ সময় টমেটো সংরক্ষণ করতে পারতেন। এতে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাজার ধরে রাখা সম্ভব হতো এবং তারা আরও ভালো দাম পেতেন।”
গাবুরা বাজারের এই কর্মব্যস্ততা প্রমাণ করে, সঠিক সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সংরক্ষণ সুবিধা পেলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে এই টমেটো বিদেশে রপ্তানি করাও সম্ভব।
