মালদ্বীপে কর্মরত প্রায় এক লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী রেমিট্যান্স পাঠাতে গিয়ে ধাপে ধাপে চরম আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। সরাসরি মালদ্বীপীয় রুফিয়া থেকে বাংলাদেশি টাকায় অর্থ প্রেরণের বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল না থাকায় বাধ্য হয়ে হুন্ডির আশ্রয় নিতে হচ্ছে তাদের। এতে প্রবাসীদের ঘামের টাকার একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে, অন্যদিকে রাষ্ট্রও হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক স্ট্যাটাস দিয়ে এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতীয় সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। একইসঙ্গে তিনি এই সংকট নিরসনে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করে চার দফা প্রস্তাবনা তুলে ধরেছেন।
যেভাবে প্রবাসীদের পকেট কাটা যাচ্ছে এমপি হাসনাত তার পোস্টে প্রবাসীদের ধাপে ধাপে ঠকার চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, মালদ্বীপের ব্যাংকগুলো ডলার ছাড়া বাংলাদেশে টাকা পাঠায় না। তাই রেমিট্যান্স পাঠাতে হলে প্রবাসীদের প্রথমে রুফিয়া দিয়ে ডলার কিনতে হয়। মালদ্বীপের সরকারি রেট অনুযায়ী প্রতি ডলারের দাম ১৫.৪৬ রুফিয়া। কিন্তু চরম ডলার সংকটের কারণে এই রেটে ডলার পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে প্রবাসীদের খোলা বাজার থেকে ২১ থেকে ২২ রুফিয়ায় ডলার কিনতে হয়। এতে শুরুতেই তাদের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ লোকসান হয়।
ডলারের এই বাড়তি দামের কারণে প্রবাসীরা বাধ্য হয়ে অনানুষ্ঠানিক পথ বা হুন্ডির আশ্রয় নেন। সেখানেও তাদের ঠকানো হয়। প্রকৃত বিনিময় হার অনুযায়ী প্রতি রুফিয়ায় প্রায় আট টাকা পাওয়ার কথা থাকলেও হুন্ডি ব্যবসায়ীরা তাদের দেন মাত্র সাড়ে পাঁচ টাকা। হাসনাত আবদুল্লাহর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, একজন প্রবাসী যদি মাসে ৫ হাজার রুফিয়া দেশে পাঠান, তবে এই দুই ধাপের লোকসানে তার ক্ষতি হয় সাড়ে ১২ হাজার টাকা। বছরে এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় দেড় লাখ টাকায়।
রাষ্ট্রের ক্ষতি ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমালোচনা প্রবাসীদের পাশাপাশি রাষ্ট্র কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেটিও উল্লেখ করেছেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, বৈধ চ্যানেল না থাকায় হুন্ডি উৎসাহিত হচ্ছে। এর ফলে এই অর্থ রেমিট্যান্স হিসেবে গণ্য হচ্ছে না, দেশের রিজার্ভেও যোগ হচ্ছে না। প্রবাসীরাও সরকারি প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
একই ধরনের সংকটে ভারতীয় প্রবাসীরা পড়লেও তাদের হাইকমিশন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্রুত হস্তক্ষেপ করে সমাধান করেছে বলে জানান তিনি। এ প্রসঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তীব্র সমালোচনা করে এই সংসদ সদস্য বলেন, “মন্ত্রণালয় এখানে ব্যর্থতা দেখিয়েছে। শ্রমবাজারগুলোতে সিন্ডিকেট তৈরি আর এজেন্সি ভাগাভাগিতে তারা ব্যস্ত। প্রবাসী ভাই-বোনদের প্রকৃত সমস্যার সমাধানে তাদের আন্তরিকতা দেখি না।”
সংকট সমাধানে ৪ প্রস্তাব সমস্যাটি সমাধানে নতুন কোনো আইন বা বড় প্রকল্পের প্রয়োজন নেই উল্লেখ করে হাসনাত আবদুল্লাহ দুটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সমঝোতা এবং সদিচ্ছার ওপর জোর দেন। তিনি চারটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছেন: ১. ডলারে রূপান্তরের ধাপটি বাদ দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে ‘রুফিয়া-টু-টাকা’ সরাসরি রেমিট্যান্স উইন্ডো চালু করা। ২. মালদ্বীপে বাংলাদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখা, এক্সচেঞ্জ হাউস বা এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করা (যেহেতু এক লাখ গ্রাহকের বাজার অলাভজনক হওয়ার কথা নয়)। ৩. স্বীকৃত এমটিওর (MTO) সঙ্গে চুক্তি করে দ্রুত বৈধ করিডোর চালু করা। ৪. কনভার্শন ফি স্বচ্ছ করা এবং প্রণোদনা সঠিক হারে দেওয়া।
গত জুনে মালদ্বীপের রাজধানী মালেতে বাংলাদেশ হাইকমিশন মালদ্বীপ মনিটারি অথরিটির সঙ্গে বৈঠকে এই সরল রেমিট্যান্স উইন্ডোর প্রস্তাব দিলেও তা এখনো আলোর মুখ দেখেনি বলে পোস্টে উল্লেখ করা হয়।
সবশেষে, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং মালেতে বাংলাদেশ হাইকমিশনকে বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধানের অনুরোধ জানান তিনি। পাশাপাশি মালদ্বীপে অবস্থানরত প্রবাসীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তারা যেন কমেন্ট বক্সে কোন ব্যাংক, কোন তারিখে, কত দরে তাদের কত ক্ষতি হয়েছে—সেই অভিজ্ঞতাগুলো তুলে ধরেন, যাতে দিনরাত পরিশ্রম করা মানুষদের ঘামের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা যায়।
