বিশেষ সংবাদদাতা | ঢাকা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ এবং হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের মামলায় বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার পরও বছরের পর বছর পেরিয়ে যাচ্ছে সাজা কার্যকরে। উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) ও আপিল শুনানির দীর্ঘসূত্রতার কারণে ফাঁসির দড়ি ছোঁয়া হচ্ছে না আসামিদের। কারা অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারের অন্ধকার কনডেমড সেলে দিন গুনছেন নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত এমন ২৭৩ জন বন্দী।
পরিসংখ্যান বলছে, স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের অপরাধে মাত্র ২৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা সম্ভব হয়েছে, যার মধ্যে ১৯ জনই ছিল ধর্ষণের পর হত্যার অপরাধী।
বছরের পর বছর ঝুলে আছে রায়, আতঙ্কে ভুক্তভোগী পরিবার
২০০৫ সালে যৌতুকের দাবিতে কিশোরী সামিনাকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় ২০১৮ সালে তার স্বামী জাফরসহ ৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। অথচ দীর্ঘ ৮ বছর পেরিয়ে গেলেও উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্সের শুনানি শেষ না হওয়ায় রায় কার্যকর হয়নি। সামিনার বৃদ্ধা মা নাজমা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এত দিনেও ফাঁসি হইলো না!” উল্টো আসামিদের স্বজনদের হুমকি ও মারধরের ভয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে তাকে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচারিক আদালতের রায়ের পর হাইকোর্টের অনুমোদন (ডেথ রেফারেন্স) এবং আসামিদের আপিল বা জেল আপিল একসঙ্গে শুনানির নিয়ম থাকলেও পেপারবুক (মামলার বৃত্তান্ত) তৈরিতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এই দীর্ঘসূত্রতা সমাজে দ্রুত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বার্তাকে বাধাগ্রস্ত করে এবং ভুক্তভোগীদের মনে চরম হতাশা তৈরি করে।
পল্লবী ট্র্যাজেডি ও নতুন আশার আলো
সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে কেটে টুকরো টুকরো করার ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় গত ৭ জুন মূল আসামি ও তার সহযোগীকে মৃত্যুদণ্ড দেন বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। এই মামলার নথিপত্র ইতিমধ্যেই হাইকোর্টে পাঠানো হয়েছে।
এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায়ের পর উচ্চ আদালতে শুনানির গতি বাড়াতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলাগুলোর (ডেথ রেফারেন্স ও আপিল) দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্টে সুনির্দিষ্ট বেঞ্চ গঠনের আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
ঠাঁই নেই কারাগারে, বেসামাল ফাঁসির আসামিরা
কারা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশের ৭৪টি কারাগারে বর্তমানে সব মামলা মিলিয়ে সর্বমোট ২ হাজার ৭০৭ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দী রয়েছেন। এর মধ্যে অনেক আসামি জামিন নিয়ে বছরের পর বছর পলাতকও রয়েছেন।
বর্তমানে দেশের কারাগারগুলোতে ৪৬ হাজার বন্দী ধারণক্ষমতার বিপরীতে গাদাগাদি করে থাকছেন প্রায় ৭৪ হাজার বন্দী। কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজনস) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন জানান, কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি বন্দী রয়েছে। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীদের সামলানো অত্যন্ত কঠিন, কারণ তারা প্রায়শই বেপরোয়া আচরণ করেন। বিচারাধীন মামলাগুলো দ্রুত শেষ করা গেলে কারাগারের এই নজিরবিহীন চাপ অনেকটাই কমে আসবে।
আইনের বিবর্তন: ২০২৬ সালের নতুন আইন
১৯৮৩ সালে প্রথম এই ধরনের অপরাধ দমনে বিশেষ অধ্যাদেশ জারি করা হয়, যা পরবর্তীতে ২০০০ সালে পূর্ণাঙ্গ আইনে রূপ নেয়। সময়ের ব্যবধানে বেশ কিছু সংশোধনের পর এটি এখন ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০২৬’ নামে কার্যকর। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই আইনে বড় কিছু পরিবর্তন আনে, যার মধ্যে ধর্ষণের তদন্তের সময় ১৫ দিন এবং বিচারের সময় ৯০ দিনে নামিয়ে আনা হয়েছে। তবে বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুত হলেও উচ্চ আদালতের দীর্ঘসূত্রতা না কমলে অপরাধীদের দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
