রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আম্মারের একটি ব্যঙ্গাত্মক ফেসবুক স্ট্যাটাস ঘিরে দেশের ছাত্ররাজনীতিতে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতার শিক্ষাবর্ষ উল্লেখ করে দেওয়া ওই পোস্টে তিনি দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রত্ব বজায় রেখে নেতৃত্বে থাকা সংস্কৃতিকে কটাক্ষ করেন। স্ট্যাটাসটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
শনিবার রাতে নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া পোস্টে সালাহউদ্দিন আম্মার লিখেছেন, ছাত্রদলের সভাপতি যখন ২০০৬-০৭ সেশনের শিক্ষার্থী, তখন তিনি মক্তবে অক্ষরজ্ঞান নিচ্ছিলেন; সেক্রেটারি ২০০৭-০৮ সেশনের সময় তিনি টিফিনের বিস্কুট নিয়ে ভাবতেন; আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতাদের শিক্ষাবর্ষের সময় তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। এরপর নিজের শিক্ষাজীবনের ধাপ টেনে তিনি বলেন, শৈশব থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে তারুণ্য পেরিয়ে তিনি এখন প্রায় কর্মজীবনের দ্বারপ্রান্তে, অথচ সংশ্লিষ্ট নেতারা এখনও ক্যাম্পাস রাজনীতির পুরোনো বৃত্তেই আবর্তিত হচ্ছেন।
স্ট্যাটাসের এক পর্যায়ে তিনি মন্তব্য করেন, “আমি পুরো জীবনের ফুল ভার্সন আপডেট দিয়ে ফেললাম, আর ওনারা এখনও সেই পুরোনো বেটা ভার্সন নিয়েই ক্যাম্পাসে।” শেষে আরও কড়া ভাষায় তিনি লেখেন, “আপনারা শুধু সিনিয়র নন, ক্যাম্পাসের ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছেন; মিউজিয়ামে রাখলে মানুষ টিকিট কেটে দেখতে আসত।”
পোস্টটি প্রকাশের পর মুহূর্তেই সেটি বিভিন্ন শিক্ষার্থী গ্রুপ, রাজনৈতিক ফোরাম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। অনেক শিক্ষার্থী এটিকে দেশের ছাত্রসংগঠনগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্ব ধরে রাখার প্রবণতার বিরুদ্ধে তীব্র সামাজিক প্রতিবাদ হিসেবে দেখছেন। তাদের ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক একাডেমিক জীবন শেষ হলেও কিছু রাজনৈতিক নেতা বছরের পর বছর ‘ছাত্র’ পরিচয় ব্যবহার করে নেতৃত্বের কেন্দ্রে থেকে যান—আম্মারের পোস্ট সেই বাস্তবতাকেই বিদ্রূপের ভাষায় সামনে এনেছে।
অন্যদিকে ছাত্রদলপন্থী কয়েকজন নেতা ও সমর্থক এই পোস্টকে দায়িত্বশীল পদে থাকা একজন ছাত্রসংসদ প্রতিনিধির অশোভন ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক আক্রমণ বলে মন্তব্য করেছেন। তাদের দাবি, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে বিদ্রূপাত্মক ভাষা ব্যবহার করে ব্যক্তিকে হেয় করা সুস্থ ছাত্ররাজনীতির অংশ নয়।
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ক্যাম্পাসে ধারাবাহিকভাবে নানা ইস্যুতে সরব অবস্থান নিচ্ছেন। শিক্ষক রাজনীতি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, দলীয় ব্যানার অপসারণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সাংগঠনিক প্রশ্নে তার একের পর এক বক্তব্য তাকে আলোচিত এবং একইসঙ্গে বিতর্কিত ছাত্রনেতায় পরিণত করেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সঙ্গে তার একাধিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্যও প্রকাশ্যে আসে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সর্বশেষ এই স্ট্যাটাস কেবল একটি ব্যক্তিগত ফেসবুক পোস্ট নয়; এটি দেশের ছাত্ররাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত ‘স্থায়ী ছাত্রনেতা’ ইস্যুকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশও একই প্রশ্ন তুলছে—বিশ্ববিদ্যালয় কি জ্ঞানচর্চার জায়গা, নাকি অনির্দিষ্টকাল নেতৃত্ব ধরে রাখার রাজনৈতিক মঞ্চ? অনলাইন আলোচনাতেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ছাত্ররাজনীতির এই দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব নিয়ে এমন প্রশ্ন বারবার উঠে এসেছে।
এদিকে আম্মারের পোস্টকে কেন্দ্র করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে নতুন করে রাজনৈতিক বাকযুদ্ধ শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, এখন সেদিকেই নজর শিক্ষাঙ্গনের।
