স্পোর্টস ডেস্ক: পশ্চিম আফ্রিকা থেকে প্রতিবছর গড়ে ১৫ হাজার তরুণকে বড় ফুটবলার বানানোর স্বপ্ন দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ইউরোপে। এদের অধিকাংশেরই শেষ পরিণতি হয় কঠোর শাস্তি, দেশান্তর কিংবা অন্ধকার কারাগার। কিন্তু ফুটবলার হওয়া যাঁর নিয়তিতে লেখা, তাঁকে রুখবে কে? জালিয়াতি ও মানব পাচারের ভয়ঙ্কর এক ফাঁদ থেকে বেঁচে ফেরা সেই কিশোরই আজ ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে আইভরিকোস্টের মহানায়ক। তিনি আর কেউ নন—ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও আইভরিকোস্টের তরুণ উইঙ্গার আমাদ দিয়ালো (Amad Diallo)।
ইনজুরি টাইমের ম্যাজিক ও বিশ্বকাপ জয়ধ্বনি
২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল আইভরিকোস্ট ও ইকুয়েডর। পুরো ম্যাচ জুড়ে আক্রমণ-প্রতিআক্রমণ চললেও স্কোরবোর্ডে ছিল শূন্য-শূন্য সমতা। ম্যাচ যখন নিশ্চিত ড্রয়ের দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে আসেন আমাদ দিয়ালো। ইনজুরি টাইমে বক্সের ভেতর বল পেয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায়, নিখুঁত এক মাপা শটে বল জালে জড়িয়ে দেন তিনি। ১-০ গোলের এই নাটকীয় জয়ে পুরো আইভরিকোস্ট মেতে ওঠে উল্লাসে, আর দিয়ালো বনে যান পুরো জাতির ত্রাতা।
আজিদামের ধুলোবালি থেকে ইতালির অন্ধকার সুড়ঙ্গ
দিয়ালোর ফুটবলার হওয়ার গল্পটা কোনো আধুনিক ইউরোপীয় একাডেমির বিলাসবহুল মাঠে শুরু হয়নি। তাঁর শৈশব কেটেছে আবিদজানের অন্যতম জনাকীর্ণ ও দরিদ্র এলাকা ‘আজিদাম’-এ, যেখানে টিকে থাকার লড়াই ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। মাত্র আট বছর বয়সে স্থানীয় কোচ হামেদ মামাদু ত্রাওরে তাঁর ভেতরের সহজাত প্রতিভা আবিষ্কার করেন।
২০১৫ সালে উন্নত জীবনের আশায় ইতালিতে পাড়ি জমান দিয়ালো। কিন্তু ২০২০ সালে ইতালিয়ান ফুটবল ফেডারেশন (FIGC) একটি চাঞ্চল্যকর মানব পাচার মামলার তদন্ত শুরু করলে জানা যায়, দিয়ালো ও হামেদ জুনিয়র ত্রাওরেকে ভুয়া মা-বাবা ও জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে অবৈধভাবে ইতালিতে আনা হয়েছিল। যেখানে এই ধরনের আইনি জটিলতায় হাজারো আফ্রিকান তরুণের ক্যারিয়ার অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়, সেখানে দিয়ালো তাঁর মানসিক শক্তিতে ভর করে মাঠের ফুটবল থেকে বিচ্যুত হননি।
ওল্ড ট্রাফোর্ডের চাপ ও নিজেকে চেনার লড়াই
ইতালির ক্লাব আতালান্তার হয়ে সিরি ‘আ’-তে অভিষেকেই গোল করে বিশ্ব ফুটবলের নজর কাড়েন দিয়ালো। এরপর ২০২১ সালে প্রায় ৩৭ মিলিয়ন পাউন্ডের বিশাল অঙ্কের বিনিময়ে ইংলিশ জায়ান্ট ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড তাঁকে দলে ভেড়ায়।
তবে ওল্ড ট্রাফোর্ডের আকাশচুম্বী প্রত্যাশার চাপ সামলানো সহজ ছিল না। নিয়মিত সুযোগ না পেয়ে তাঁকে ধারে (Loan) খেলতে হয়েছে রেঞ্জার্স ও সান্ডারল্যান্ডের মতো ক্লাবে। কিন্তু এই কঠিন সময়টাই দিয়ালোকে মানসিকভাবে পরিণত করে তোলে। তিনি বুঝতে শেখেন, শুধু প্রতিভা দিয়ে নয়, টিকে থাকতে হলে প্রয়োজন ধৈর্য আর কঠোর পরিশ্রম। অবশেষে ম্যানচেস্টারের মূল দলে নিজের জায়গা পুনরুদ্ধার করে আইভরিকোস্টের হয়ে বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন পূরণ করেন তিনি।
