রোববার, ২৪ মে ২০২৬
Logo
×
এমপি নিজামকে মঞ্চেই বলেছিলেন তিনি

“আগে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করেন”—শহীদ কন্যার বাবার কণ্ঠে জনতার না-পাওয়া হিসাব

প্রথম সমাচার ডেস্ক ০৪ মে ২০২৬, ০১:৩২ অপরাহ্ন

লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আশরাফ উদ্দিন নিজাম যখন মঞ্চে বক্তব্য দিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই জনতার ভিড় চিরে পিছন দিক থেকে ভেসে আসে এক ভারী কণ্ঠ—“আগে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করেন।” এটি ছিল কেবল একটি বাক্য নয়; ছিল অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতির বিরুদ্ধে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস, ক্ষোভ এবং শহীদ পরিবারের নীরব আর্তনাদের উচ্চারণ।

এই কথাটি বলেছিলেন নারী শহীদ মেহেরুন্নেসা তানহার বাবা মোশারফ হোসেন। একজন বাবা, যিনি ২২ বছর ধরে স্নেহে-ভালোবাসায় মেয়েকে বড় করেছেন; যিনি তাকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিলেন, মানুষ হতে শিখিয়েছিলেন। সেই মেয়েই জুলাইয়ের আন্দোলনে ঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমেছিল। দেশ বদলের স্বপ্নে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসে, সে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিল গণমানুষের লড়াইয়ে।

১৯ জুলাই তার মামাতো ভাই রাব্বি শহীদ হওয়ার পর তানহার ভেতরের ক্ষোভ আরও প্রবল হয়ে ওঠে। সেই ক্ষত, সেই রক্ত, সেই শোক বুকে নিয়েই ৫ আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলনের মাঠে সক্রিয় ছিল সে। শেষ পর্যন্ত গণভবন অভিমুখে মানুষের বিজয়মিছিলে অংশ নেয়, ইতিহাসের অংশ হয়, পরিবর্তনের বিশ্বাস বুকে নিয়ে।

সেদিন রাতে গণভবন থেকে মা-বাবার জন্য ফুল হাতে নিয়ে মিরপুর কাফরুলের বাসায় ফিরে আসে তানহা। হয়তো ভেবেছিল, বিজয়ের ফুল তুলে দেবে বাবা-মায়ের হাতে। কিন্তু ভাগ্য তখন অন্য এক নির্মম পরিণতি লিখে রেখেছিল। বাসায় ফেরার কিছুক্ষণের মধ্যেই বাইরে থেকে ছোড়া একটি গুলি জানালা ভেদ করে এসে বিদ্ধ করে তার শরীর। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় এলাকায় এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ চলছিল। মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে তানহা। মুখ দিয়ে রক্ত বের হতে থাকে, ঘরের মেঝে লাল হয়ে যায়।

একজন বাবা তখন নিজের বুকের ভেতর পৃথিবীর সবচেয়ে অসহনীয় দৃশ্য দেখেন—তার সন্তানের রক্তে ভিজে যায় নিজের শরীরের কাপড়। সেই রক্তমাখা শার্ট-প্যান্ট কোনো সাধারণ পোশাক নয়; তা এক বাবার ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া জীবনের দলিল। যে বাবা নিজের হাতে মেয়েকে বড় করেছেন, তিনি কীভাবে ভুলবেন সেই রাত? কীভাবে ভুলবেন মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা রক্ত, মেয়ের নিথর দেহ, আর শেষবারের মতো ফুল হাতে ফিরে আসা সেই মুখটি?

এই রক্ত কি কেবল ব্যক্তিগত শোকের গল্প? না—এটি ছিল পরিবর্তনের জন্য ঝরা রক্ত। ন্যায়বিচার, জবাবদিহি, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার দাবিতে ঝরা রক্ত। তাই শহীদের বাবারা আজ কেবল শোকাহত অভিভাবক নন; তারা অপূর্ণ বিপ্লবের সাক্ষী। তাদের কণ্ঠস্বরকে উপেক্ষা করা মানে সেই রক্তের দায় এড়িয়ে যাওয়া।

“আগে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করেন”—এই একটি বাক্যে তাই লুকিয়ে আছে জনতার পক্ষ থেকে শাসকদের প্রতি কঠিন স্মরণবার্তা: শহীদের রক্তকে কেবল মঞ্চের ভাষণ বা স্মরণসভায় ব্যবহার করলে চলবে না, সেই রক্তের বিনিময়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তব ফল মানুষ দেখতে চায়।

আর এই কারণেই, শহীদের বাবারা যখন কথা বলেন, তখন তাদের পাশে শুধু পরিবার নয়—দাঁড়িয়ে যায় পুরো জনতা। কারণ মানুষ জানে, এই কান্না ব্যক্তিগত নয়; এটি একটি জাতির অসমাপ্ত হিসাব।

শেয়ার করুন:
লিঙ্ক কপি হয়েছে
Loading
আরও নিউজ লোড হচ্ছে...