পাঁচ বছর আগে যদি কেউ আমাকে বলত যে একদিন আমি চীনা ভাষা শিখব, চীনে পড়াশোনা করব এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলব, তাহলে হয়তো আমি অবাক হতাম! কিন্তু আজ যখন আমার এই অসীম যাত্রার দিকে ফিরে তাকাই, তখন মনে হয় চীনা ভাষার সঙ্গে আমার পরিচয় শুধু একটি ভাষা শেখার গল্প নয়; এটি নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কারের গল্প, নতুন সংস্কৃতিকে জানার গল্প এবং পৃথিবীকে আরও বড় করে দেখার গল্প।

আমার চীনা ভাষা শেখার যাত্রা শুরু হয় ২০২০ সালে। তখন আমি জানতাম না সামনে কতটা দীর্ঘ পথ অপেক্ষা করছে। শেখা শুরুর মাত্র তিন মাস পরেই করোনা মহামারির কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। অনেকের মতো আমিও ভেবেছিলাম হয়তো সবকিছু থেমে যাবে। কিন্তু শেখার ইচ্ছা থামেনি। আমাদের বিভাগ শিক্ষার্থীদের জন্য বেইজিং ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড কালচার ইউনিভার্সিটির অনলাইন কোর্সের ব্যবস্থা করে।
ভাষার পথে প্রথম যখন, পা বাড়ালাম ধীরে,
অজানা এক নতুন জগৎ ডাকল আমায় ফিরে।

শুরুর দিনগুলো সহজ ছিল না। পিনইনের চারটি স্বর বারবার ভুল করতাম। চীনা অক্ষরগুলো দেখতে সুন্দর লাগলেও মনে রাখা কঠিন ছিল। কখনো কখনো মনে হতো, এত জটিল একটি ভাষা আমি আদৌ শিখতে পারব কি না। কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম, প্রতিটি নতুন শব্দ, প্রতিটি নতুন অক্ষর আমাকে একটি নতুন সংস্কৃতির আরও কাছে নিয়ে যাচ্ছে। সেই উপলব্ধিই আমাকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দিয়েছে।
ভাষা শেখার সঙ্গে সঙ্গে চীনা সংস্কৃতির প্রতিও আমার আগ্রহ বাড়তে থাকে। ক্যালিগ্রাফির তুলির আঁচড়ে আমি সৌন্দর্য খুঁজে পেয়েছি, চা-সংস্কৃতির মধ্যে খুঁজে পেয়েছি ধৈর্য ও সৌজন্যের শিক্ষা। কবিতা আবৃত্তি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং চীনা নৃত্যের অভিজ্ঞতা আমাকে বুঝিয়েছে যে একটি ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি একটি জাতির ইতিহাস, অনুভূতি এবং জীবনদর্শনের বাহক।
গত বছর আমার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা ঘটে। আমি কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের বৃত্তি লাভ করি এবং কুইচৌ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সুযোগ পাই। বহুদিন ধরে বইয়ে পড়া ও ভিডিওতে দেখা চীনকে এবার আমি নিজের চোখে দেখতে শুরু করি।
কুইচৌ বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে প্রথম যে বিষয়টি আমাকে মুগ্ধ করেছিল, তা হলো এর আন্তর্জাতিক পরিবেশ। আমার সহপাঠীরা এসেছিল মিয়ানমার, রাশিয়া, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে। আমাদের ভাষা আলাদা ছিল, সংস্কৃতি আলাদা ছিল, কিন্তু কৌতূহল, স্বপ্ন এবং শেখার আগ্রহ ছিল এক।
শুরুতে আমরা একে অপরের কাছে ছিলাম অপরিচিত। কিন্তু খুব দ্রুত সেই দূরত্ব কমে আসে। ক্লাসে আমরা একসঙ্গে নাটক করেছি, দলগত উপস্থাপনা দিয়েছি, চীনা চলচ্চিত্র ও অ্যানিমেশন নিয়ে আলোচনা করেছি। একসঙ্গে হাসতে হাসতে, শিখতে শিখতে আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে বন্ধুত্বের জন্য একই ভাষা বা একই দেশ প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন আন্তরিকতা।
পড়াশোনার বাইরে কুইয়াং শহরের পাহাড় এবং মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক দৃশ্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমি বিভিন্ন শহর ও দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখেছি, স্থানীয় খাবারের স্বাদ নিয়েছি এবং মানুষের জীবনযাত্রাকে কাছ থেকে দেখেছি। কিন্তু প্রকৃতির সৌন্দর্যের চেয়েও বেশি আমাকে স্পর্শ করেছে মানুষের আন্তরিকতা।

আমার কয়েকজন চীনা বন্ধু একদিন আমাকে তাদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানায়। হয়তো ঘটনাটি খুব সাধারণ, কিন্তু আমার কাছে তা ছিল অসাধারণ। একসঙ্গে বসে খাবার খাওয়া, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গল্প করা এবং তাদের আন্তরিক ব্যবহার আমাকে এমন এক অনুভূতি দিয়েছিল, যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সেদিন আমি অনুভব করেছিলাম যে আমি একজন অতিথি নই; আমি যেন তাদের পরিবারেরই একজন সদস্য।
সেই মুহূর্তে আমি বুঝতে পারি, “পরিবার” শব্দটির অর্থ শুধু রক্তের সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবার হলো সেই জায়গা, যেখানে মানুষ আপনাকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করে, সম্মান করে এবং ভালোবাসা দেয়।
চীনে কাটানো সময় আমাকে শুধু ভাষা শেখায়নি। এটি আমাকে আরও আত্মবিশ্বাসী করেছে, আরও সহনশীল করেছে এবং ভিন্ন সংস্কৃতিকে সম্মান করতে শিখিয়েছে। আমি শিখেছি, মানুষের পরিচয় তার জাতীয়তা দিয়ে নয়, তার মানবিকতা দিয়ে নির্ধারিত হয়।
সুদূর চীনের একটি প্রবাদ আছে—“有朋自远方来,不亦乐乎?” অর্থাৎ, “দূর দেশ থেকে বন্ধু এলে তার চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে?” কুইচৌতে কাটানো দিনগুলো আমাকে এই কথার গভীর অর্থ উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছে।
আজ আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, পর্বত আমাদের আলাদা করতে পারে, সাগর আমাদের দূরে রাখতে পারে, কিন্তু আন্তরিকতা মানুষকে একত্রিত করে। ভাষা ভিন্ন হতে পারে, সংস্কৃতি ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু হৃদয়ের ভাষা সর্বত্র এক।
তাই আমার কাছে চীনে পড়াশোনার অভিজ্ঞতা শুধু শিক্ষাজীবনের একটি অধ্যায় নয়; এটি এমন একটি যাত্রা, যা আমাকে শিখিয়েছে—পৃথিবী যত বড়ই হোক, মানুষে মানুষে আত্মার বন্ধন তার চেয়েও বড়।
অনিকা আক্তার
চীনা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
