চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে। সেই থেকে আজ একশ দিন পেরিয়ে গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরুতে দাবি করেছিলেন এই যুদ্ধ অত্যন্ত দ্রুত শেষ হবে।
তবে তিন মাসেরও বেশি সময় পার হওয়ার পরও সংঘাত থামেনি, বরং তা ইরান ছাড়িয়ে লেবানন, উপসাগরীয় অঞ্চল ও আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রাণহানির দিক থেকে এই যুদ্ধ ইতিমধ্যে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। একশ দিনে ইরানে নিহত হয়েছেন কমপক্ষে তিন হাজার চারশ আটষট্টি জন। লেবাননে নিহতের সংখ্যা আরও বেশি — তিন হাজার পাঁচশ তিরানব্বই জন।
সেই সঙ্গে দশ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। উপসাগরীয় দেশগুলোতে উনত্রিশ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ইরানের পাল্টা হামলায় ছাব্বিশ জন ইসরায়েলি ও তেরো জন মার্কিন সৈনিকও নিহত হয়েছেন।
যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই ইরান বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম লাফিয়ে বাড়তে থাকে। যুদ্ধের দশম দিনেই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি একশ আট ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের পর সর্বোচ্চ।
একশ দিনেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। মার্কিন নৌবাহিনী প্রণালির উপর দিয়ে ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করে চলেছে, তবু সেই জলপথ কার্যত অবরুদ্ধই রয়ে গেছে।
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এই যুদ্ধের প্রভাব ইতিমধ্যে মারাত্মক আকার নিয়েছে। হিসাব বলছে, এই সংঘাত মার্কিন পরিবারগুলোর উপর সামরিক ব্যয় ও জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি মিলিয়ে প্রায় একশ বিলিয়ন ডলারের বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
এপ্রিলে মার্কিন মূল্যস্ফীতি তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ তিন দশমিক আট শতাংশে পৌঁছেছে এবং পেট্রোলের দাম যুদ্ধের আগের তুলনায় প্রতি গ্যালনে এক ডলারেরও বেশি বেড়েছে। শুধু তেল বাণিজ্যেই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় পঞ্চাশ বিলিয়ন ডলার।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সতর্ক করেছে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তিন দশমিক এক শতাংশ থেকে নেমে দুই শতাংশে ঠেকতে পারে।
এপ্রিলের আট তারিখে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু সেই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসরায়েল লেবাননে শতাধিক বিমান হামলা চালায়, যাতে আড়াই শতাধিক মানুষ প্রাণ হারান।
এরপর ইসলামাবাদে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে সরাসরি আলোচনা হলেও তা ভেঙে পড়ে। ইরানের জমাটবাঁধা সম্পদ ফেরত ও লেবাননে হিজবুল্লাহ প্রশ্নে দুই পক্ষের অবস্থান এখনও বিপরীত মেরুতে।
ইরানের ভেতরে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। দেশটির মুদ্রা রিয়াল ঐতিহাসিক সর্বনিম্নের কাছে এসে ঠেকেছে — প্রতি মার্কিন ডলারে প্রায় সতেরো লাখ সত্তর হাজার রিয়ালে নেমেছে।
রাজধানী তেহরানে দোকানপাট খোলা থাকলেও ক্রেতার সংখ্যা আগের চেয়ে অনেক কম। তবুও তেহরান প্রশাসন প্রকাশ্যে অনড় অবস্থান ধরে রেখেছে এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে আসছে।
একশ দিন পেরিয়েও যুদ্ধ একটি অনিশ্চিত অচলাবস্থায় আটকে আছে। ইরান ড্রোন ছাড়ছে, মার্কিন বাহিনী সেগুলো ভূপাতিত করছে, কিন্তু কেউ পরিস্থিতি আর বাড়াচ্ছে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনার মধ্যে সত্যিকার শান্তির পথ এখনও দৃশ্যমান নয়।
