বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Logo
×

কাবা চত্ত্বরে আসমানি প্রশিক্ষণের স্মৃতিচিহ্ন মুসল্লা জিবরাইল

প্রথম সমাচার ডেস্ক ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৪৬ অপরাহ্ন
ইসলামের পবিত্রতম স্থান পবিত্র কাবাঘর। যার প্রান্তরের প্রতিটি কোণে বহু ইতিহাস লুকিয়ে আছে। এখানকার বাতাসে যেন মিশে আছে নবুয়তের স্মৃতির মধুর সুবাস। এখানে আসা মুসল্লিরা যেদিকে তাকায়, সেদিকেই যেন হজরত ইবরাহিম (আ.), আম্মাজান হাজেরা (আ.) ও ইসলমাঈল (আ.) থেকে শুরু করে মহানবী (সা.)— এর স্মৃতিগুলো ভেসে ওঠে।  এখানে দাঁড়ালে মনে হয়, সময় যেন থমকে গেছে; হাজার বছর আগের সেই পবিত্র মুহূর্তগুলো আজও বেঁচে আছে পাথরের বুকে, ধূলিকণার ভাঁজে। এই প্রাঙ্গণের প্রতিটি কোণ যেন এক একটি জীবন্ত সাক্ষী, মহানবী (সা.)-এর মোবারক স্পর্শ, পদচিহ্ন, উম্মাহর জন্য তাঁর বিসর্জন দেওয়া মোবারক অশ্রু, আর আসমানি শিক্ষার দীপ্তিময় অধ্যায়ের।

এই পবিত্র স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোর অন্যতম হলো কাবা শরিফের দরজার পাশে শাধারাওয়ানের (কাবা শরিফের নিচের অংশ ঘিরে থাকা এক ধরনের উঁচু, ঢালু মার্বেল বর্ডার বা ঘের) উপর অবস্থিত সেই স্মৃতিময় মার্বেলখণ্ডগুলো, যেগুলোকে বলা হয় ‘মুসাল্লা জিবরাইল’ বা জিবরাইলের নামাজের স্থান। এগুলো নিছক পাথর নয়; এগুলো এমন এক ঐতিহাসিক মঞ্চ, যেখানে মহান আল্লাহর প্রেরিত আসমানি শিক্ষক পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নবীকে শিখিয়েছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ নামাজের বাস্তব রূপ।

মিরাজের সেই অলৌকিক সফর শেষে, যখন নবীজি (সা.) ফিরে এলেন, তখন এই স্থানেই ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) তাঁকে হাতে-কলমে শেখালেন নামাজের সময় ও পদ্ধতি, যে নামাজ কিয়ামত পর্যন্ত দুনিয়াতে আসা সব মুসলমানের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু, আত্মার প্রশান্তি, মহান আল্লাহর সঙ্গে সংযোগের সেতু।

হাদিস শরীফে সে মহিমান্বিত দিনের কথা উল্লেখ রয়েছে। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বাইতুল্লাহর নিকট জিবরাইল (আ.) দুবার আমার নামাজে ইমামতি করেছেন।

(১) প্রথমবার সূর্য (পশ্চিম আকাশে) ঢলে যাওয়ার পর আমাকে নিয়ে তিনি জোহর নামাজ আদায় করলেন। তখন (পূর্ব দিকে) জুতার ফিতার সমান ছায়া দেখা গিয়েছিল। (২) অতঃপর তিনি আমাকে নিয়ে আসর নামাজ আদায় করলেন, যখন (প্রত্যেক বস্তুর) ছায়া তার সমান হয়। (৩) এরপর আমাকে নিয়ে তিনি মাগরিব নামাজ আদায় করলেন, যখন রোজা পালনকারীর ইফতারের সময় হয়। (৪) তিনি আমাকে নিয়ে এশা নামাজ আদায় করলেন যখন সন্ধ্যার আভা মিলিয়ে গিয়েছিল এবং ফজর নামাজ আদায় করলেন যখন রোজাদারের জন্য খানা ও পানাহার হারাম হয়ে যায়।

পরদিন তিনি আমাকে নিয়ে জোহরের নামাজ আদায় করলেন, যখন (প্রত্যেক বস্তুর) ছায়া তার সমান হয় এবং আসর নামাজ আদায় করলেন, যখন (প্রত্যেক বস্তুর) ছায়া তার দ্বিগুণ হয়। মাগরিব নামাজ আদায় করলেন, যখন রোজা পালনকারীর ইফতারের সময় হয় এবং এশার নামাজ আদায় করলেন রাতের তৃতীয়াংশ পর্যন্ত এবং ফজর নামাজ আদায় করলেন, তখন চারিপাশ আলোকিত হয়ে গিয়েছিল।
অতঃপর জিবরাইল (আ.) আমার দিকে ফিরে বললেন, হে মুহাম্মদ (সা.)! এটাই হচ্ছে আপনার পূর্ববর্তী নবীদের নামাজের ওয়াক্ত এবং ওয়াক্তসমূহ এ দু সময়ের মাঝেই নিহিত। (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৯৩)

এই হাদিস কেবল সময়ের সীমারেখা নির্ধারণ করে না; বরং এটি প্রমাণ করে, নামাজ কোনো সাধারণ ইবাদত নয়ম বরং এটি আসমান থেকে সরাসরি শেখানো এক মহামূল্যবান উপহার।

যেই উপহারের চিহ্ন বহন করে আছে, মুসাল্লা জিবরাইল বা জিবরাইলের নামাজের স্থান। সম্ভবত কাবা শরীফের এই অংশ বরাবর দাঁড়িয়ে জিবরাইল (আ.) মহানবী (সা.)-কে নামাজের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। বর্তমানে জায়গাটি চিহ্নিত আছে, আটটি বিশেষ মার্বেলখণ্ড দিয়ে। এই মার্বেল ‘মেরি স্টোন’ নামে পরিচিত পৃথিবীর বিরলতম পাথরগুলোর একটি। খলিফা আবু জাফর আল-মানসুর এগুলো উপহার হিসেবে প্রদান করেছিলেন। প্রতিটি টুকরোর আকার ভিন্ন; সবচেয়ে বড়টির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৩ সেন্টিমিটার এবং প্রস্থ ২১ সেন্টিমিটার।

প্রতিটি পাথর খণ্ডই যেন আজও চিত্কার করে বলে ইসলামের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ নামাজের প্রশিক্ষণের সূচনালগ্নের পবিত্র ইতিহাস। এই ইতিহাস জানার পর যারা এই পাথরের দিকে দৃষ্টি দেয়, তাদের হূদয়ে নবীপ্রেমের ঝড় বয়ে যায়। তাদের নিয়ে দেড় হাজার বছর আগের সেই কাবাপ্রাঙ্গনে, যেখানে জিবরাইল (আ.) সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানব ও নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে নামাজের প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন।

শেয়ার করুন:
লিঙ্ক কপি হয়েছে
Loading
আরও নিউজ লোড হচ্ছে...