তামিলনাড়ু হয়তো গত পাঁচ দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো একেবারে নতুন একটি রাজনৈতিক শক্তির উত্থান প্রত্যক্ষ করছে। এটি কোনো গোষ্ঠী নয়, কোনো ভাঙন নয়, কিংবা পরিচিত দ্রাবিড় রাজনৈতিক ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসও নয়, বরং তার এক ধরনের মৌলিক ব্যাঘাত বা ভাঙন। এমন ঘটনা শেষবার বড় পরিসরে ঘটেছিল যখন এম জি রামচন্দ্রন ডিএমকে ছেড়ে বেরিয়ে এসে সিনেমার জনপ্রিয়তাকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করেছিলেন। সেই ঘটনাটিরও শিকড় ছিল আরও পুরনো এক রাজনৈতিক নকশায়- সি এন অন্নাদুরাই এবং ডিএমকে বহু দশক ধরে নাটক ও সিনেমাকে গণরাজনৈতিক যোগাযোগের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলেছিলÑ একটি এমন ব্যবস্থা তৈরি করেছিল যেখানে পর্দা সাবলীলভাবে রাজনীতি বলতো।
এখন বিজয় সেই ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছেন। কিন্তু তার ভেতরে বেড়ে ওঠেননি। আর এখানেই এই মুহূর্তটিকে আলাদা করে তোলে। যেখানে কেরালার সাম্প্রতিক নির্বাচন স্পষ্ট অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি ও জনদুর্ভোগ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, সেখানে তামিলনাড়ুর মানসিকতা যেন অন্য পথে এগিয়েছে: অর্ধশতাব্দী ধরে পরিচিত রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের পর একটি নতুন মুখের জন্য নীরব কিন্তু জমতে থাকা আকাঙ্ক্ষা। একইসঙ্গে শাসক গোষ্ঠীর প্রতি, বিশেষ করে দুর্নীতি নিয়ে জনমতের প্রেক্ষাপটে এক ধরনের গভীর বিরক্তি। যদিও তা অনেক সময় অপ্রকাশিত। সমালোচকদের চোখে এই শাসনব্যবস্থা ক্রমশ হয়ে উঠেছে গোষ্ঠীবদ্ধ, বংশানুক্রমিক এবং কখনো কখনো রাজনৈতিকভাবে আত্মতুষ্ট।
এটি কোনো ক্লাসিক অ্যান্টি-সরকার ঢেউ নয়। বরং এটি কিছুটা কম নাটকীয়, কিন্তু সম্ভবত আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু, আবেগিক আনুগত্যের পুনর্বিন্যাস। প্রাথমিক প্রবণতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বিজয়ের তামিলাগা ভেট্রি কাজাগম (টিভিকে) এই মনোভাবকে বড় পরিসরে ধরতে পেরেছে। এই এগিয়ে থাকা শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে কি না, বা তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু এই উত্থানের ব্যাপ্তি- যা চেন্নাইয়ের মতো শহরাঞ্চলকেও ছুঁয়ে গেছে, ইতিমধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধরন বদলে দিয়েছে। এখন বিভিন্ন শিবিরে খোলাখুলিভাবে এমন সম্ভাবনার কথাও বলা হচ্ছে যে, ঝুলন্ত বিধানসভাও আর অসম্ভব মনে হচ্ছে না।
তামিলনাড়ুতে চলচ্চিত্র তারকাদের রাজনীতিতে আসা নতুন কিছু নয়। তবে তাদের একটি নির্দিষ্ট ধারা ছিল। অন্নাদুরাই ও এম করুণানিধি সিনেমাকে ব্যবহার করেছেন আদর্শ গড়ে তুলতে। এম জি রামচন্দ্রন সেই আদর্শের ভিত্তিতে দল গড়েছেন। জয়ললিতা সেই কাঠামো উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়ে শক্তিশালী করেছেন। এমনকি পরবর্তী সময়ে যারা এসেছেন, তারাও এই কাঠামোর ভেতরে বা বিপরীতে কাজ করেছেন। বিজয়ের উত্থান আদর্শগত প্রশিক্ষণ বা দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়ে নয়। এটি দাঁড়িয়ে আছে তার দর্শকদের সঙ্গে সরাসরি, প্রায় মধ্যস্থতাহীন সম্পর্কের ওপর; যা এখন রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়েছে। এটি ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতি নয়, বরং ‘চরিত্র’-ভিত্তিক রাজনীতি। বিজয়ের সমর্থকরা সব সময় নীতি বা আদর্শের ভাষায় কথা বলেন না। তারা কথা বলেন পরিচিতির ভাষায়- সিনেমা, সংলাপ এবং এমন একজন মানুষকে ঘিরে যাকে তারা বহু বছর ধরে দেখে আসছেন। সেই অর্থে, এটি সম্ভবত তামিলনাড়ুতে সিনেমা থেকে রাজনীতিতে রূপান্তরের সবচেয়ে সরাসরি উদাহরণ।
এই নির্বাচনী পর্যায়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো বিজয়ের সমর্থনের জনসংখ্যাগত বৈশিষ্ট্য। তামিলনাড়ুর শহর ও আধা-শহরাঞ্চলে নারী ও তরুণ ভোটারদের মধ্যে তার প্রতি আগ্রহ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। নারী ভোটারদের জন্য, যারা দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যের কল্যাণভিত্তিক রাজনীতির কেন্দ্রে, তারা এই আকর্ষণ শুধু কর্মসূচিভিত্তিক নয়, বরং আবেগঘনও: স্নেহ, সহজপ্রাপ্যতার ধারণা এবং প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শ্রেণিবিন্যাস থেকে বেরিয়ে আসার আকাক্সক্ষার মিশ্রণ। তরুণ ভোটারদের জন্য, বিশেষ করে যারা এম জি রামচন্দ্রন এবং জয়ললিতা পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় হয়েছে, বিজয় এমন একজন ব্যক্তি, যিনি তাদের কাছে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া নয়, বরং সমসাময়িক বলে মনে হয়।
এর আগে ভাইকো, বিজয়কান্ত বা কামাল হাসানের মতো বিকল্পরা এই প্রজন্মগত পরিবর্তনকে পুরোপুরি ধরতে পারেননি। কিন্তু বিজয় এমন এক সময়ে এসেছেন, যখন নতুন ভোটারদের সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে তিনি আগেই প্রতিষ্ঠিত।
বিজয়ের উত্থান যেমন এক দিক, তেমনি অন্য দিকটি হলো প্রতিষ্ঠিত কাঠামোর প্রতি ক্লান্তি। এই নির্বাচনে ডিএমকের বিরুদ্ধে সমালোচনা, বিশেষ করে প্রতিদ্বন্দ্বী শিবির ও ভোটারদের একটি অংশের মধ্যে প্রধানত ক্ষমতার পারিবারিক কেন্দ্রীকরণ এবং নেতৃত্বের উত্তরাধিকারের প্রশ্নকে ঘিরে। বিশেষ করে উপমুখ্যমন্ত্রী উদয়নিধি স্টালিনের উত্থান নিয়ে রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ছাড়াও কিছু বিতর্কিত মন্তব্যকে বিরোধীরা ব্যবহার করেছে বিচারবোধ ও সংবেদনশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার জন্য। এগুলোর কোনোটিই একা একা শক্তিশালী অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি ঢেউ তৈরি করে না। কিন্তু একত্রে এগুলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে ভোটারদের একটি অংশ দুই প্রধান দ্রাবিড় দলের বাইরে তাকাতে প্রস্তুত।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট চিত্র দেখা যাচ্ছে চেন্নাইয়ে। ঐতিহাসিকভাবে শহরটি রাজনৈতিকভাবে ওঠানামা করলেও নির্দিষ্ট সীমার মধ্যেই থেকেছে। এআইএডিএমকে দীর্ঘদিন এখানে দুর্বল ছিল- ১৯৭৭ সালে মাত্র একটি আসন, ১৯৮০ সালে দু’টি, আর ১৯৯৬ সালে একটিও নয়। তারপর জয়ললিতার সময়ে ২০০৬ ও ২০১১-তে সাফল্য আসে। ২০২১ সালে ডিএমকে সব ১৬টি আসন জিতে শহরটিকে তাদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু এবার সেই নিশ্চয়তা চ্যালেঞ্জের মুখে। প্রাথমিক প্রবণতা ও মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, টিভিকে শুধু উপস্থিতই নয়, অনেক এলাকায় প্রতিযোগিতামূলক- এমনকি এগিয়েও আছে। যদি এই ধারা বজায় থাকে, তবে এটি এমজিআরের সময়ের পর প্রথমবার কোনো নতুন দলের বড় শহুরে সাফল্য হবে। এমনকি মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্টালিন এবং উপমুখ্যমন্ত্রী উদয়নিধির আসনেও টিভিকে এগিয়ে থাকার খবর রয়েছে।
বিজয়কে এমজিআরের পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখার প্রবণতা আছে। কিন্তু এই তুলনা সীমিত। এমজিআরের ছিল আদর্শ, সংগঠন এবং দ্রাবিড় আন্দোলনের ভেতরে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। বিজয় এসেছেন সেই কাঠামো ছাড়াই। তার যা আছে, তা হলো একেবারে আধুনিক এক শক্তি: মিডিয়া, সময় এবং জনপ্রিয়তার মাধ্যমে তৈরি সরাসরি আবেগিক সংযোগ। এই অর্থে তিনি যেমন তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি ফল, তেমনি তার একটি ব্যতিক্রমও। তামিলনাড়ু যা প্রত্যক্ষ করছে, তা হয়তো প্রচলিত অর্থে কোনো ঢেউ নয়। এটি হয়তো আরও নীরব কিছু বিশ্বাসের পুনর্বণ্টন। আর যদি এই প্রাথমিক সংকেতগুলো সত্যি প্রমাণিত হয়, তবে এটি শুধু একজন বিজয়ীই তৈরি করবে না, বরং এমন একটি নতুন প্রশ্নও তুলবে, যার মুখোমুখি রাজ্যটি বহু দশক ধরে হয়নি: এক শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা যখন এমন এক শক্তির মুখোমুখি হয়, যাকে সে পুরোপুরি কল্পনাও করেনি- তখন কী ঘটে? এর উত্তর হয়তো সোমবারই মিলবে।
