রোববার, ২৪ মে ২০২৬
Logo
×

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন: গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনের আভাস, নাকি প্রত্যাশার অর্ধেক পূরণ?

প্রথম সমাচার ডেস্ক ০৫ মে ২০২৬, ১২:৪০ পূর্বাহ্ন

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন সমাপ্ত হয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন, নির্বাচন-পূর্ব অনিশ্চয়তা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতির পর গঠিত এই সংসদকে ঘিরে জনমনে প্রত্যাশা ছিল স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি। কারণ এটি কেবল একটি নতুন সংসদের সূচনা নয়; বরং বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে প্রশ্নবিদ্ধ প্রতিনিধিত্ব, দুর্বল বিরোধী রাজনীতি এবং একমুখী আইন প্রণয়নের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে সংসদীয় গণতন্ত্রকে পুনরায় কার্যকর করার একটি পরীক্ষামঞ্চ। গত ১২ মার্চ শুরু হয়ে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত চলা এই প্রথম অধিবেশন কার্যদিবস, প্রশ্নোত্তর, রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর দীর্ঘ আলোচনা এবং বিপুল সংখ্যক আইনগত কাজ সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে।

প্রথমেই যে বিষয়টি ইতিবাচকভাবে সামনে আসে, তা হলো—সংসদকে অন্তত ‘কার্যকর কর্মক্ষেত্র’ হিসেবে সচল করার একটি দৃশ্যমান চেষ্টা ছিল। সংসদ সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর প্রায় ৫০ ঘণ্টা আলোচনা বরাদ্দ করা হয়; ৪৬৮টি প্রশ্ন জমা পড়ে, যার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর জন্যও প্রশ্ন ছিল। পাশাপাশি রুল ৭১ ও রুল ১৩১-এর অধীনে একাধিক মনোযোগ আকর্ষণী নোটিশ ও প্রস্তাব উত্থাপিত হয়।
সংখ্যাগুলো নিছক পরিসংখ্যান নয়—এগুলো প্রমাণ করে, সংসদকে আগের মতো শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক সিলমোহর দেওয়ার জায়গা বানিয়ে রাখার প্রবণতা থেকে কিছুটা হলেও বেরিয়ে আসার চেষ্টা হয়েছে। সদস্যদের অংশগ্রহণ, বক্তব্যের বহুমাত্রিকতা এবং সরকারি সিদ্ধান্তের ওপর আনুষ্ঠানিক জবাবদিহির পরিসর তৈরি হওয়া—এসব গণতান্ত্রিক পুনরুদ্ধারের প্রাথমিক লক্ষণ।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি হলো আইনগত শূন্যতা দ্রুত পূরণের উদ্যোগ। অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সময়ে জারি হওয়া ১১৭টি অধ্যাদেশের বিপরীতে সংসদে ৯১টি বিল পাস করে সেগুলোর সাংবিধানিক বৈধতা নিশ্চিত করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
রাষ্ট্র পরিচালনায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এটি জরুরি ছিল। কারণ দীর্ঘদিন অধ্যাদেশনির্ভর শাসন সংসদীয় আইন প্রণয়নের স্বাভাবিক রীতিকে দুর্বল করে। নতুন সংসদ অন্তত সেই সাংবিধানিক শূন্যতাকে স্বীকার করেছে এবং আইনসভাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছে—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

তৃতীয় ইতিবাচক পরিবর্তন হচ্ছে—বিরোধী দলের দৃশ্যমান উপস্থিতি। অতীতের অনেক সংসদে বিরোধী কণ্ঠ ছিল হয় নিষ্ক্রিয়, নয়তো নিয়ন্ত্রিত। এবার বিরোধী বেঞ্চ থেকে সরকারের অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, নির্বাচন-পরবর্তী পুনর্বাসন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন উঠেছে। যদিও সেই প্রশ্নের সবকটির সন্তোষজনক উত্তর মেলেনি, তবুও সংসদকক্ষে মতবিনিময়ের এই রাজনৈতিক আবহ সংসদীয় সংস্কৃতির জন্য সুসংবাদ। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য একমত হওয়ায় নয়, মতপার্থক্যকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ধারণ করতে পারায়—ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে তার সামান্য হলেও প্রতিফলন দেখা গেছে।

তবে সব অর্জনের মাঝেও অপ্রাপ্তির তালিকাও কম নয়—বরং কিছু ক্ষেত্রে তা আরও গভীর। সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা ছিল, আলোচনা হয়েছে অনেক; কিন্তু নীতিগত রূপরেখা স্পষ্ট হয়েছে তুলনামূলক কম। জনগণ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, ব্যাংক খাতের অনিশ্চয়তা, স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়, শিক্ষাব্যবস্থার বৈষম্য এবং স্থানীয় সরকার পুনর্গঠনের মতো জরুরি প্রশ্নে নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা আশা করেছিল। সংসদে এসব বিষয়ে বক্তৃতা হয়েছে, দায় স্বীকারও করা হয়েছে, কিন্তু সময়বদ্ধ বাস্তবায়ন রূপরেখা এখনো অস্পষ্ট। সংসদ কেবল বক্তৃতার মঞ্চ হলে চলবে না; এটি হতে হবে নীতিনির্ধারণের কার্যকর ল্যাবরেটরি।

আরও একটি অপ্রাপ্তি হলো—প্রথম অধিবেশনে জনমুখী উচ্চপ্রভাবসম্পন্ন সংস্কার বিল খুব বেশি দৃশ্যমান হয়নি। নির্বাচন-পূর্ব সময়ে যে সাংবিধানিক সংস্কার, বিচার বিভাগের কাঠামোগত স্বাধীনতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি, দুর্নীতি দমন ব্যবস্থার পুনর্গঠন কিংবা সংসদীয় কমিটিকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার বড় অংশই এখনো আলোচনার স্তরে। জনগণ সংসদ থেকে প্রতীকী বক্তব্যের চেয়ে কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা দেখতে চেয়েছিল।

এছাড়া অধিবেশনের একটি বাস্তব সীমাবদ্ধতা ছিল সময় ব্যবস্থাপনা। অনেক সদস্য দীর্ঘ রাজনৈতিক ভাষণ দিলেও বিশেষজ্ঞনির্ভর তথ্যভিত্তিক বিতর্ক তুলনামূলক কম হয়েছে। উন্নত সংসদীয় চর্চায় দেখা যায়—প্রতিটি বিল, বাজেট বা নীতির অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংবিধানিক প্রভাব বিশ্লেষণ করে কথা বলা হয়। আমাদের সংসদ এখনো সেই বিশ্লেষণধর্মী পরিণতিতে পুরোপুরি পৌঁছাতে পারেনি। আবেগ ও দলীয় অবস্থান অনেক সময় তথ্যসমৃদ্ধ বিতর্ককে ছাপিয়ে গেছে।

সবশেষে বলা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনকে ব্যর্থ বলা যাবে না; আবার একে যুগান্তকারী সাফল্য বলাও অতিরঞ্জন হবে। এটি ছিল একটি ‘রিস্টার্ট সেশন’—যেখানে সংসদকে সচল করা হয়েছে, বিরোধী কণ্ঠের কিছুটা জায়গা তৈরি হয়েছে, আইনগত ধারাবাহিকতা ফিরেছে এবং আনুষ্ঠানিক গণতন্ত্রের কাঠামো পুনরায় দৃশ্যমান হয়েছে। কিন্তু জনগণ যে গভীর রাষ্ট্রীয় সংস্কার, দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং বাস্তব জীবনে প্রভাব ফেলা উদ্যোগ প্রত্যাশা করেছিল, তার অনেকটাই এখনো অপেক্ষমাণ।

অর্থাৎ, এই অধিবেশন আমাদের আশা দেখিয়েছে—কিন্তু নিশ্চয়তা দেয়নি।
গণতন্ত্রের দরজা খুলেছে—কিন্তু ঘরের ভেতর আলো পুরোপুরি জ্বলেনি।
এখন দেখার বিষয়, পরবর্তী অধিবেশনগুলোতে জাতীয় সংসদ কেবল কথার প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকে, নাকি সত্যিকার অর্থে জনগণের রাষ্ট্র নির্মাণের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

শেয়ার করুন:
লিঙ্ক কপি হয়েছে
Loading
আরও নিউজ লোড হচ্ছে...