মুসলমান জাতীয়তাবাদীরা নজরুলকে মুসলমানের কবি বানাতে চায়। নজরুলের মুসলমানদের প্রতি কোন আলাদা টান ছিল না, নজরুল নারীবাদী, নজরুল অসাম্প্রদায়িক ইত্যাদি, ইত্যাদি।
শাহাবাগিরা এই বয়ান প্রচার করে। প্রকৃত অবস্থা হল যদি মুসলমান জাতীয়তাবাদীরা না থাকতো তাহলে শাহাবাগিরা নজরুলকে বাংলাদেশের জনপরিসর থেকে মাইনাস করে দিত। গত ২০ বছর শাহাবাগিরা ক্ষমতায় থেকে নজরুলের কি অবস্থা করেছে?
এক:
প্রথম আলো চেস্টা চালিয়েছে নজরুলকে বাংলা সাহিত্যের তৃতীয় স্থানে ঠেলে দিতে;
১। রবীন্দ্রনাথ = সবচেয়ে বড়
২। জীবনানন্দ = আধুনিকতার প্রতীক
৩। নজরুল = ‘তৃতীয়’ বা ‘কম গুরুত্বপূর্ণ’
এটা সাহিত্যিক মূল্যায়ন নয়—এটা ক্যানন–বিল্ডিং।
ক্যানন সব সময় রাজনৈতিক হয়। এখানে নজরুলকে অপ্রোয়জনীয় হিসেবে দেখানো হয়। এরপরের কাজ সেটাকে রেজোনেট করে।
দুই:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যে অনার্স প্রোগ্রামে নজরুলের সাহিত্যকর্ম কমাতে কমাতে প্রায় নাই করে দেয়। চার বছরে মোট ৩২০০ নম্বরের মধ্যে নজরুলের সাহিত্য সংক্রান্ত সিলেবাস ছিল মাত্র ১৬ নম্বরের।
এটা নিছক সাহিত্যিক সিদ্ধান্ত নয়—এটা সাংস্কৃতিক অগ্রাধিকারের প্রতিফলন, একটা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক–সাংস্কৃতিক প্রকল্পকে শক্তিশালী করা।
তিন:
স্কুল–কলেজের বাংলা প্রথম পত্রের সিলেবাসে নজরুলের লেখা গল্প/কবিতা অর্ধেক করা হয়। অগুরুত্বপূর্ণ তাই তার লেখা কম। এটা সামগ্রিক সাংস্কৃতিক ইঞ্জিনিয়ারিং।
চার:
বিদ্রোহী কবি হিসেবে নজরুল সর্বজন স্বীকৃত। সেখানে রবীন্দ্রনাথকে বিদ্রোহের কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রনাথের একটা অতিকায় মূর্তি বসিয়ে।
কারণ “বিদ্রোহ” শব্দটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে অত্যন্ত শক্তিশালী। এখানে নজরুলের জায়গা দখল করার চেষ্টা স্পষ্ট।
পাঁচ:
দুই সপ্তাহ আগে রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে শাহাবাগিরা প্রচার করেছে জুলাই বিপ্লবে রবীন্দ্রনাথের গান ছিল অনুপ্রেরণার উৎস।
বাস্তবতা হল জুলাই বিপ্লবে রবীন্দ্রনাথের একটা গানও ব্যবহৃত হয়নি।
অন্যদিকে জুলাইতে নজরুলের ৫ টা গান, একাধিক কবিতা মিছিল, দেয়াল লেখন, শহীদের স্ট্যাটাস, থেকে ইন্টারনেটে জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু নজরুলের জন্মদিনে একবারের জন্যও এরা বলে নাই— জুলাই বিপ্লবে নজরুল ছিল অনুপ্রেরণার উৎস।
এটা ন্যারেটিভ কন্ট্রোল—যেখানে বিদ্রোহের প্রতীকী মালিকানা রবীন্দ্রনাথকে দেবার অপচেষ্টা চলছে।
অর্থাৎ নজরুলের সিগনেচার ভূমিকা তথা দ্রোহ, প্রতিবাদের কবি; শাহাবাগিরা সেটাকে অস্বীকার করে ধীরে ধীরে সেখানে রবীন্দ্রনাথকে বসাতে চাচ্ছে।
ছয়:
শাহবাগিদের প্রধান ঠাকুর হুমায়ূন আজাদ নজরুল সম্পর্কে বলেছে—’ নজরুল মাঝারি মানের কুসংস্কারাচ্ছন্ন বিভ্রান্ত লেখক’। শুধু তাই না নজরুল ‘বাঙলা ভাষার বিভ্রান্ত কুসংস্কার-উদ্দীপ্ত লেখকদের মধ্যে প্রধান’।
কোন শাহাবাগি হু. আজাদের এই কথার প্রতিবাদ করে নাই। আজাদের এই বইকে শাহাবাগিরা সেলিব্রেট করে।
সাত:
গত ৫৫ বছরে শাহাবাগিদের সাংস্কৃতিক জমিদারি কায়েম থাকার কারনে নজরুলকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া যায়নি। আগে জাতীয় কবি ছিল মুখে মুখে।
জুলাই বিপ্লবের পরে ইন্টারিম সরকারের সময় আমাদের ভাইদের, একেবারে নির্দিষ্ট করে বললে:
১। লতিফুল ইসলাম শিবলী [সবচেয়ে বেশি ভূমিকা]।
২। কবি আব্দুল হাই শিকদার
৩। শহীদ শরিফ ওসমান হাদি
৪। ইনকিলাব মঞ্চ
প্রমুখের অব্যাহত চাপের কারনে ইন্টারিম সরকার কাজী নজরুল ইসলামকে জাতীয় কবি হিসেবে ঘোষণা করে।
নজরুলের জাতীয় মর্যাদা এসেছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিবর্তনের ফলে, মুসলমান জাতীয়তাবাদীদের প্রচেষ্টায়, শাহবাগিদের সাংস্কৃতিক আধিপত্য দুর্বল হওয়ার কারণে।
শাহাবাগিদের কালচারাল জমিদারি থাকলে আজও আমরা নজরুলকে জাতীয় কবির মর্যাদা দিতে পারতাম না।
আমি গত দুই দিনে বলেছি পলাশীর পরে নজরুল হল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাংলাভাষী মুসলমান। কারন:
১। তিনি বাংলাভাষী মুসলমানদের আইডেন্টিটি রিডিফাইন করেছেন।
২। আরবি-ফারসি-উর্দু শব্দ ব্যবহার করে ফোট উইলিমায়ের হিন্দু পন্ডিত এবং পাদ্রীদের বিকৃত করা বাংলাকে মুল ধারায় ফেরত এনেছেন।
৩। তিনি দ্রোহের কবি, প্রতিবাদের কবি।
শাহবাগিরা এই তিনটা ভূমিকাকেই অস্বীকার করে প্রথমে নজরুলকে বাংলাভাষী মুসলমানদের থেকে ছিনিয়ে নিতে চায়। এরপর নজরুলকে অগুরুত্বপূর্ণ, বিভ্রান্ত হিসেবে উপস্থাপন, এবং ফাইনালি পাবলিক ডিসকোর্স থেকে নজরুলকে সরিয়ে দিতে চায়।
লেখক: মীর সালমান সামিল, পিএইচডি গবেষক, জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র।
