বাংলাদেশে যে পরিমাণ মানুষরুপী জন্তু-জানোয়ারের বসবাস—ভাবতেই কেমন বিপন্ন লাগে! যা আমাদেরকে রীতিমতো দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ট্রমার মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। দেশের একটি প্রথম সারির জাতীয় দৈনিক রামিসাকে নিয়ে সংবাদ করেছে। সংবাদে ব্যবহার করেছে ছোট্ট রামিসার একটা শাড়ি পরা ছবি। আহামরি কোনো সাজগোজও নয়—একটা ছোট্ট মেয়ে, শখ করে শাড়ি পরে ছবি তুলেছে। সেই সংবাদের নিচে একজন লোক কমেন্ট করেছে— “এত সাজগোজ ভালো নয়।” একটা ৭ বছরের বাচ্চা মেয়ের এত নিরীহ একটা ছবি দেখে এই লোকের মনে হয়েছে—রামিসার এই সাজগোজই হয়তো তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার জন্য দায়ী!
আরেকজন লিখেছে—রামিসার বয়স নাকি সাতের মতো লাগে না; বরং তার ধারণা, আরও দুই-চার বছর বড় হবে। অর্থাৎ, তার দৃষ্টিভঙ্গি এমন যে, একটু বড় দেখালেই ধর্ষণ ও হত্যা যেন জায়েজ হয়ে যায়!আরেকজন দায়ী করেছে ঘাতকের স্ত্রীকে—সে নাকি স্বামীকে দ্বিতীয় বিয়ে করতে দেয়নি, তাই তার “উগ্রতা” কমেনি, তাই শিশুকে ধর্ষণ করেছে! আরেকজন লিখেছে— “ছোট হলেও পর্দা করা উচিত ছিল।”
তাহলে দেখেন— আমরা হয়তো ঘাতক সোহেল রানার মতো এক-দুই-চারজনকে চিনি, তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা উগরে দিই। কিন্তু আমার পোস্টে কমেন্ট করা যে লোক এই ঘটনায় পুরুষের দ্বিতীয় বিয়ের উপাদান খুঁজে পেল, কিংবা জাতীয় দৈনিকের সংবাদের নিচে কমেন্ট করা যে লোক ছোট্ট রামিসার সাজগোজকে দায়ী করল, আরেকজন পর্দা না করাকে কারণ বানাল—এদের কয়জনকে আপনি খুঁজে খুঁজে শোধরাবেন?
আর যে বলল “রামিসাকে দেখতে বড় লাগে”—তার দৃষ্টিও তো সেই রেপিস্টের মতোই বিকৃত! এই ধরনের মানসিকতা লালনকারীদের সংখ্যা অসংখ্য, অগণিত। আমরা একটা অন্ধকার সমাজে বসবাস করছি। এখানে যারা আলোর কথা বলে, তারাও অনেক সময় অন্ধকারই বিক্রি করে।
এই বিচারহীনতার দেশেই বোধহয় রামিসার বাবা বিচার চাননি। কার কাছে চাইবেন? যে রাষ্ট্র কিছুদিন পর রেপিস্টকে জামিনে মুক্তি দেয়, তার কাছে? নাকি সেই সমাজের কাছে, যারা প্রতিনিয়ত রেপিস্ট মানসিকতা লালন-পালন করে?
মানুষ আসলে বিচার চাইতে চাইতে ভীষণ ক্লান্ত। বলে-কয়ে আর লাভ নেই—বিচার পাওয়া যায় না। একটা সহজ কথা বলি, সকল অভিভাবকের উদ্দেশ্যে— আপনার ঘরে যদি একটা কন্যাশিশু থাকে, তাহলে পীরের কাছেও মেয়েকে একা দেবেন না। কাউকে বিশ্বাস করবেন না—না ঘরে, না বাইরে। সারাক্ষণ মেয়েকে চোখে চোখে রাখবেন। আপনার চোখই যেন হয় তার নিরাপত্তা। (রব তো আছেনই।)
আপনার কন্যাশিশুকে কে কোলে নিচ্ছে, সে কার সঙ্গে খেলছে—খেয়াল রাখুন। ঘরে, বাইরে, স্কুলে, খেলার মাঠে, আত্মীয়ের বাসায়—কে কেমন আচরণ করছে, তা লক্ষ্য করুন।
আমাদের মায়েরা অনেক সময় খুব কেয়ারলেস হয়ে যান। কোনো আত্মীয় বা পুরুষ মানুষ আপনার শিশুকে চুমু দিচ্ছে কি না, সেটাও খেয়াল করুন। বাবা ছাড়া অন্য কোনো পুরুষকে চুমু দিতে দেবেন না। কেউ দিতে চাইলে স্পষ্টভাবে বাধা দিন। কাউকে কোলে দিতেও বাধ্য নন আপনি।
আর হ্যাঁ—কাউকে বিশ্বাস করবেন না। কাউকে না। সবাইকে সন্দেহ করুন। কে আপনার শিশুকে খেলনা দিচ্ছে, চকলেট দিচ্ছে—সেটাও দেখুন। দিতে হলে আপনার সামনেই দিক, আড়ালে নয়।
আমি আপাতত এটুকুই বলতে চাই— শুধু মহিলা, নারী বা মেয়ে বলেই আপনার সন্তানকে যার-তার সঙ্গে মিশতে দেবেন না। এখন আর শুধু পুরুষ নয়—নারীও অনেক ক্ষেত্রে আপনার মেয়ের জন্য নিরাপত্তাহীনতার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।
আপনার বাচ্চাকে হরহামেশা পাশের ফ্ল্যাটে যেতে দেবেন না—সমবয়সী ছেলে বা মেয়ে বাচ্চা থাকলেও না। ৬–১৪ বছর বয়সী মেয়েদের যে যৌন নিপীড়ন হয়, তার বড় একটি অংশ ঘটে “খেলাধুলার ছলে”, “কার্টুন দেখানোর লোভে”, কিংবা “চকলেট-খেলনা দিয়ে বশ করে”।
যারা নিয়মিত পত্রিকার পাতা উল্টান, তারা জানেন—এসব ঘটনার কত ভয়াবহ বিস্তার। আপনার সন্তানকে কেউ আদর করবে? সমস্যা নেই। কিন্তু সেটা আপনার সামনেই করতে দিন।
আপনার আড়ালে গিয়ে কারও বাসায় খেলা করা, কার্টুন দেখা—এসব এখন ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে সে বাসায় পুরুষ থাকলে।
এখনকার বাচ্চারাও অনেক বেশি এক্সপোজড। গ্রামের বাচ্চারা কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে। গতকাল একটা পোস্ট দেখলাম— সমবয়সী এক বাচ্চা ছেলে তার মেয়ে ক্লাসমেটকে ব্যাড টাচ করেছে। বিচার দিতে গেলে সেই ছেলের অভিভাবক উল্টো বলছে— “বাচ্চারা অত বুঝে নাকি! এ বয়সে এসব হয়! আপনি এত সিরিয়াস কেন?”
ভাবতে পারেন? এই হলো অনেক পুরুষ সন্তানের অভিভাবকদের মানসিকতা। তাই বলি—আপনার সন্তানকে সময় দিন। রিলসের দুনিয়া থেকে বের হয়ে তার সঙ্গে খেলুন, কথা বলুন। তাকে সতর্ক করুন—আপনি না থাকলে কারও কাছে যাওয়ার দরকার নেই। না দোকানি মামার কাছে, না আইসক্রিম মামার কাছে, না পাশের বাচ্চা ছেলে বন্ধুর কাছে।
আপনার মনে হতে পারে—এসব আচরণ পরিচিত মানুষদের কাছে অস্বাভাবিক লাগবে। আমি বলি—ভদ্রতা তুলে রাখুন ফ্রিজে! কারণ, আজকাল যা ঘটছে—তা কি আদৌ স্বাভাবিক?
আমরা এমন এক কলিযুগে বাস করছি, যেখানে মেয়েদের সহযোগিতায়ও মেয়ে ধর্ষিত হচ্ছে, হত্যা করা হচ্ছে। শেষে এটুকুই বলি— নিজেদের জন্য নিজেদেরই একটি নিরাপদ বলয় তৈরি করুন।
নিজের পরিবারকে নিয়ে নিরাপদ থাকার চেষ্টা করুন।
লেখক: জান্নাতুন নাঈম, লেখক ও এক্টিভিস্ট।
