গাছে গাছে সবুজ পাতার ফাঁকে ঝুলছে গাঢ় লাল, খয়েরি ও গোলাপি রঙের থোকা থোকা লিচু। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে লিচুর মিষ্টি সুবাস। রোদ-ছায়ার খেলায় ফলগুলো যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, যা গ্রামবাংলার এক অনন্য সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তুলেছে। মৌসুমের এই সময়ে লিচুর রাজধানীখ্যাত দিনাজপুরের বাগানগুলো এখন শুধু ফলের বাগান নয়, বরং তা পরিণত হয়েছে কৃষকের স্বপ্ন, আনন্দ আর প্রকৃতির উদারতার এক মহা উৎসবে।
দিনাজপুর জেলার প্রায় সব এলাকাতেই কমবেশি লিচুর আবাদ হয়। তবে সবচেয়ে বেশি চাষ হচ্ছে সদর উপজেলার মাসিমপুর, ঘুঘুডাঙ্গা, উলিপুর; বিরল উপজেলার মাধববাটি, করলা, রবিপুর, মহেশপুর, বটহাট; খানসামার গোলাপগঞ্জ, কাচিনীয়া; বীরগঞ্জের সনকা এবং চিরিরবন্দরের কারেন্টহাট এলাকায়। এসব অঞ্চলের বেলে-দোআঁশ মাটি লিচু চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। লাভজনক হওয়ায় এই অঞ্চলের মানুষের কাছে লিচুর আবাদ দিন দিন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
এসব বাগানে মাদ্রাজি, বেদানা, বোম্বাই, চায়না-থ্রি, মোজাফফরি, কাঁঠালিসহ বিভিন্ন জাতের সুস্বাদু লিচুর আবাদ হলেও বাজারে বোম্বাই ও বেদানা জাতের লিচুর আধিক্য এবং চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। সুমিষ্ট, রসালো ও অতুলনীয় স্বাদের জন্য দিনাজপুরের লিচুর খ্যাতি দেশ ছাড়িয়ে এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে, গত বছর ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই (GI) পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে দিনাজপুরের বিখ্যাত ‘বেদানা লিচু’।
জিআই পণ্যের এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার বিষয়টিকে নিজেদের জন্য অত্যন্ত গর্বের মনে করছেন স্থানীয় লিচু চাষিরা। তবে গর্বের পাশাপাশি তাঁদের মনে কিছু প্রত্যাশাও রয়েছে। চাষিদের মতে, আন্তর্জাতিক এই স্বীকৃতিকে কাজে লাগিয়ে যদি সরকারি উদ্যোগে দিনাজপুর থেকে সরাসরি বিদেশে লিচু রপ্তানির সুব্যবস্থা করা যেত, তবে তারা আরও অনেক বেশি লাভবান হতেন এবং দেশের অর্থনীতিতেও এটি বড় অবদান রাখত।
আপাতত রপ্তানির জটিলতা ছাপিয়ে বাগানমালিক, মৌসুমি ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের ব্যস্ততায় মুখর পুরো দিনাজপুর। দূর-দূরান্ত থেকে পাইকাররা আসছেন লিচু কিনতে, আর সাধারণ মানুষ আসছেন সতেজ লিচুর স্বাদ নিতে। সব মিলিয়ে লিচুকে কেন্দ্র করে উত্তরের এই জেলায় এখন চলছে এক উৎসবমুখর পরিবেশ, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে এক বিশাল জোয়ার নিয়ে এসেছে।
