রোববার, ২৪ মে ২০২৬
Logo
×

হজের সফরের কিছু আদব ও দিকনির্দেশনা

প্রথম সমাচার ডেস্ক ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৪৮ অপরাহ্ন
হজ কেবল একটি দেশভ্রমণ বা শারীরিক কসরত নয়; বরং এটি হলো রূহের সফর, মাওলার সান্নিধ্য লাভের এক অনন্য সোপান। জীবনের সমস্ত ব্যস্ততা ফেলে শুভ্র কাফনসদৃশ দুই টুকরো কাপড় পরে যখন একজন মুমিন ‘লাব্বাইক’ ধ্বনি দিয়ে মক্কার পথে পা বাড়ান, তখন তার একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি। এই দীর্ঘ ও পবিত্র সফরে হাজিদের জন্য কিছু বিশেষ গুণাবলি অর্জন এবং কিছু বিষয়ের প্রতি সজাগ থাকা অপরিহার্য।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হজ্জে মাবরুর বা কবুল হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।’ আর সেই ‘মাবরুর’ হজ লাভের জন্য সফরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং প্রতিটি কদম সুন্নাহ অনুযায়ী ফেলা জরুরি।

১. সর্বাবস্থায় আল্লাহর স্মরণ ও ইখলাস

হজের যাবতীয় আমলের মূল রূহ বা প্রাণ হলো আল্লাহ তাআলার স্মরণ। মিনা, আরাফাহ, মুজদালিফা, প্রতিটি স্থানের ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য হলো হৃদয়ে আল্লাহর বড়ত্ব প্রতিষ্ঠা করা। এজন্য প্রতিটি আমল শুরু করার আগে অন্তরে দৃঢ় ইখলাস থাকা চাই। হাজিদের উচিত প্রতিটি কাজ শুরুর আগে মনে মনে এ দোয়া করা, হে আল্লাহ!

একমাত্র আপনার সন্তুষ্টির জন্য আমি এ আমলটি করছি, আপনি এটি সহজ করুন এবং কবুল করুন। যদি কোনো আমল চলাকালীন মন অন্য দিকে চলে যায়, তবে তৎক্ষণাৎ ইস্তিগফার করে পুনরায় আল্লাহর ধ্যানে ফিরে আসতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি দোয়া ও আমলের অর্থ জেনে নেওয়া উচিত, যাতে পড়ার সময় হৃদয়ে গভীর অনুভূতি জাগ্রত হয়।

২. সুন্নাহর যথাযথ অনুসরণ

হজ কবুল হওয়ার প্রধান শর্ত হলো তা নবীজি (সা.)-এর দেখানো পদ্ধতিতে হওয়া। হজের প্রতিটি কার্যাবলীর পেছনে কিছু নির্দিষ্ট সুন্নাহ রয়েছে। ইহরাম বাঁধা থেকে শুরু করে পাথর মারা, প্রতিটি ক্ষেত্রে সুন্নাহর প্রতি যত্নবান হতে হবে। সুন্নাহর অবহেলা হজের বরকত নষ্ট করে দেয়। তাই প্রত্যেক হাজি সাহেবের উচিত প্রতিটি আমলের আগে নির্ভরযোগ্য কিতাব থেকে বা আলেমদের কাছ থেকে সেই আমলের সুন্নাহগুলো জেনে নেওয়া।

৩. নামাজের প্রতি বিশেষ সতর্কতা

সফরের ক্লান্তি বা ভিড়ের কারণে অনেক সময় নামাজের বিষয়ে অবহেলা দেখা দেয়, যা মোটেও কাম্য নয়। বিমানে আসা-যাওয়ার পথে হোক কিংবা মিনা-মুজদালিফার তপ্ত রোদে, নামাজ কাযা করা যাবে না। বিশেষ করে বিমানে নামাজের নিয়ম এবং মিনা-আরাফায় কসর বা পূর্ণ নামাজের মাসায়েলগুলো আগেভাগেই বিজ্ঞ আলেমদের থেকে জেনে নিতে হবে। নামাজ হলো মুমিনের মেরাজ, আর হজের সফরে সেই নামাজের গুরুত্ব আরও বহুগুণ বেড়ে যায়।

৪. সবর ও হাসিমুখে কষ্ট বরণ

হজ ও কষ্ট—এ দুটি শব্দ একে অপরের পরিপূরক। হজরত ইবরাহিম (আ.), ইসমাইল (আ.) এবং আম্মাজান হাজেরা (রা.)-এর অসীম ত্যাগের স্মারক হলো এই হজ। বর্তমান সময়ে সুযোগ-সুবিধা অনেক বাড়লেও হজের সফরে কিছু না কিছু কষ্টের সম্মুখীন হতেই হয়।

এই কষ্টগুলোকে বিরক্তি হিসেবে না দেখে ‘হজের রূহ’ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। আম্মাজান আয়েশা (রা.)-কে নবীজি (সা.) বলেছিলেন, তোমার সওয়াব তোমার কষ্ট ও ব্যয়ের পরিমাণ অনুযায়ী হবে। (মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদিস : ১৯৩৩)

তাই সফরের যেকোনো প্রতিকূলতাকে হাসিমুখে মেনে নেওয়াই হলো প্রকৃত সবর।

৫. গুনাহ ও ঝগড়া-বিবাদ থেকে দূরে থাকা

ইহরাম অবস্থায় মুমিনের ওপর কিছু বিশেষ বিধিনিষেধ আরোপিত হয়। কোরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, হজের নির্দিষ্ট কয়েকটি মাস আছে। যে ব্যক্তি সেই সময়ে নিজের ওপর হজ অবধারিত করে নেয়, সে হজের সময়ে কোনো অশ্লীল কথা বলবে না, কোনো গুনাহ করবে না এবং ঝগড়াও করবে না। (সুরা : বাকারা, আয়াত :১৯৭)

হজের পবিত্র পরিবেশে কুদৃষ্টি, গিবত ও পরনিন্দা থেকে কঠোরভাবে বেঁচে থাকতে হবে। বাসের সিট, হোটেলের রুম বা খাবার নিয়ে সফরসঙ্গীদের সাথে ঝগড়া করা হজের মাহাত্ম্য নষ্ট করে দেয়। বিশেষ করে মিনায় থাকার জায়গা নিয়ে ঝগড়া বেশি হয়, যা থেকে একজন মুখলেস হাজিকে অবশ্যই দূরে থাকতে হবে। কাউকে ক্ষমা করে দিলে আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষমা পাওয়া সহজ হয়, এই উপলব্ধি অন্তরে রাখতে হবে।

৬. অন্যের সেবা ও সম্মান বজায় রাখা

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, প্রকৃত মুসলিম সেই, যার হাত ও জবান থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১০) হজের সফরসঙ্গীরা হলেন আল্লাহর মেহমান। তাই তাদের কোনোভাবে কষ্ট দেওয়া মানে স্বয়ং আল্লাহর মেজবানিকে অসম্মান করা। হারামাইনের অধিবাসী এবং অন্য হাজিদের সাথে সর্বদা নম্র আচরণ করতে হবে। গ্রুপ লিডার বা অন্যদের দোষারোপ না করে যেকোনো সমস্যা পরামর্শের মাধ্যমে সমাধান করা উচিত।

৭. খরচে উদারতা ও কৃপণতা বর্জন

হজের সফরে খরচ করাকে আল্লাহর রাস্তায় খরচের সমতুল্য ধরা হয়েছে, যার সওয়াব সাতশ গুণ পর্যন্ত হতে পারে। প্রয়োজনীয় খরচের ক্ষেত্রে কার্পণ্য না করে বরং উদার হওয়া উচিত। বিশেষ করে সফরসঙ্গীদের সেবার উদ্দেশ্যে ব্যয় করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় থাকে, না হয় অপচয়, না হয় কৃপণতা। কোরআনের ভাষায় মুমিনের গুণ হলো, তারা ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখে। (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ৬৭)

৮. প্রযুক্তি ও সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার থেকে সুরক্ষা

বর্তমান সময়ে হজের আধ্যাত্মিকতা নষ্ট করার অন্যতম হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে মোবাইল ও সোশ্যাল মিডিয়া। হাজি সাহেবরা পবিত্র কাবার সামনে দাঁড়িয়েও ইবাদত ফেলে সেলফি তোলা বা ফেসবুক লাইভে ব্যস্ত থাকেন। এটি অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। শরীর পবিত্র ভূমিতে থাকলেও মন পড়ে থাকে ভার্চুয়াল জগতে। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া মোবাইল ও ইন্টারনেটের ব্যবহার বর্জন করা উচিত। মনে রাখতে হবে, আপনি আল্লাহর দরবারে হাজির হয়েছেন ছবি তোলার জন্য নয়, বরং নিজের জীবন পরিবর্তনের জন্য।

৯. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও টয়লেট ব্যবহারে সতর্কতা

‘পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ’ এই শিক্ষার প্রতিফলন হজের সফরে থাকা জরুরি। লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগমে পরিবেশ নোংরা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই বিমান, রাস্তাঘাট ও থাকার জায়গা পরিষ্কার রাখতে হবে। বিশেষ করে টয়লেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে অতি সচেতনতা প্রয়োজন। টয়লেট ব্যবহারের পর পর্যাপ্ত পানি ব্যবহার করা, টিস্যু বা বর্জ্য নির্ধারিত ঝুড়িতে ফেলা এবং মেঝে শুকনো রাখা ঈমানি দায়িত্ব। আপনার কারণে যেন অন্য কোনো বয়স্ক বা অসুস্থ হাজি সাহেব পিচ্ছিল মেঝেতে পড়ে না যান, সেদিকে খেয়াল রাখা ইবাদতেরই অংশ। অজু করার জন্য টয়লেটের ভেতরটা ব্যবহার না করে নির্ধারিত জায়গা ব্যবহার করাই শ্রেয়।

১০. আমলের ভিন্নতা দেখে বিচলিত না হওয়া

মক্কা-মদিনার বরকতময় পরিবেশে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুসলমানদের আমলের পদ্ধতিতে ভিন্নতা দেখা যেতে পারে। এতে বিচলিত হওয়ার বা বিতর্কে জড়ানোর কোনো প্রয়োজন নেই। আমাদের দেশের আলেমদের ইলম ও তাকওয়ার ওপর আস্থা রেখে হানাফি মাজহাব অনুযায়ী নিজের আমলগুলো করে যেতে হবে। মনে রাখতে হবে, স্বীকৃত চারটি মাজহাবের প্রতিটিই কোরআন ও সুন্নাহর নির্যাস। বিতর্কে লিপ্ত হওয়া মানে অমূল্য সময় নষ্ট করা।

১১. শপিং ও অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা বর্জন

হজের শেষ সময়ে অনেক হাজি সাহেব শপিং নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন। কেনাকাটায় অতিরিক্ত সময় ব্যয় করা হজের মূল উদ্দেশ্যকে ম্লান করে দেয়। এটি কেনাকাটার সফর নয়, বরং এটি হলো ইশক ও মহব্বতের সফর। দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করে আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহ করাই এই সফরের আসল প্রাপ্তি।

মনে রাখবেন! হজ একজন মুমিনের জীবনে একবারই আসে। এই স্বল্প সময়ের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে যিনি আল্লাহর মকবুল বান্দা হিসেবে ফিরে আসতে পারেন, তিনিই সফল। উপরোক্ত আদব ও নিয়মগুলো মেনে চললে হজের সফর কেবল আরামদায়কই হবে না, বরং তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে ‘হজ্জে মাবরুর’ হিসেবে কবুল হওয়ার পথ প্রশস্ত করবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকল হাজিকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং তাদের হজ কবুল করুন। আমিন

শেয়ার করুন:
লিঙ্ক কপি হয়েছে
Loading
আরও নিউজ লোড হচ্ছে...