বৈশাখের শুরুতেই তীব্র গরমে পুড়ছে দেশ। কাঠফাটা রোদ আর ভ্যাপসা আবহাওয়ায় জনজীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, সামনে তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে, যদিও ২০২৪ সালের মতো দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের আশঙ্কা আপাতত কম।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে দেশে দুই থেকে চারটি মৃদু এবং এক থেকে দুইটি তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে—বিশেষ করে যশোর, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, ঈশ্বরদী, বদলগাছী ও রাজশাহী অঞ্চলে। দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস বলছে, এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে ছয় থেকে আটটি মৃদু এবং তিন থেকে চারটি তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে।
সাধারণভাবে ৩৬-৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে মৃদু, ৩৮-৪০ ডিগ্রিকে মাঝারি এবং ৪০-৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসকে তীব্র তাপপ্রবাহ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশে এপ্রিল মাসকে বছরের সবচেয়ে উষ্ণ সময় ধরা হয়। আগে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তাপপ্রবাহ সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন তা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, চলতি বছর বজ্রঝড় তুলনামূলক বেশি হতে পারে, যা তাপমাত্রা কিছুটা কমাতে ভূমিকা রাখবে। ২০২৪ সালে বজ্রঝড় কম থাকায় ওই বছর টানা ৩৫ দিন তাপপ্রবাহ চলেছিল এবং তাপমাত্রা ৭৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
এদিকে বৈশ্বিক আবহাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এল নিনো আবারও সক্রিয় হওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, জুলাইয়ের শেষ বা আগস্টের শুরুতে এটি সক্রিয় হতে পারে, যার প্রভাব আগে থেকেই অনুভূত হতে পারে। এল নিনো সক্রিয় হলে তাপমাত্রা বাড়া, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া এবং খরার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, মার্চ থেকে মে পর্যন্ত নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরে এনসো-নিরপেক্ষ অবস্থা থাকার সম্ভাবনা প্রায় ৬০ শতাংশ। তবে পরবর্তী সময়ে উষ্ণ প্রবণতা বাড়তে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ বলেন, আগামী কয়েকদিন তাপমাত্রা বাড়তে পারে এবং মাঝারি তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে। তবে মাসের শেষ দিকে বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ বছর ২০২৪ সালের মতো দীর্ঘমেয়াদি তীব্র তাপপ্রবাহ নাও হতে পারে।
জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক জানান, এল নিনো সক্রিয় হলে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ে এবং এর প্রভাব বাংলাদেশেও কিছুটা পড়ে। এতে বর্ষাকালে বৃষ্টিপাত কমে যেতে পারে এবং তাপমাত্রা বাড়তে পারে।
অন্যদিকে, গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বিদ্যুতের চাহিদা। পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৫ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছালেও উৎপাদনে ঘাটতি থাকায় প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বাড়ছে।
শহরাঞ্চলে তুলনামূলক কম লোডশেডিং হলেও গ্রাম ও মফস্বলে পরিস্থিতি বেশি খারাপ। অনেক এলাকায় দিনে ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না বলে জানা গেছে। এতে তীব্র গরমে জনজীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি সংকট, কয়লার স্বল্পতা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কারণে উৎপাদন কমে গেছে। কিছু কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালু না থাকায় প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট উৎপাদন কমে গেছে।
বিপিডিবির সদস্য মো. জহুরুল ইসলাম জানান, কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণে থাকায় সাময়িকভাবে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তবে বেশ কয়েকটি ইউনিট ইতোমধ্যে উৎপাদনে ফিরেছে এবং পরিস্থিতি দ্রুত উন্নতির দিকে যাচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ফারজানা মমতাজ বলেন, গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা মোকাবিলায় প্রস্তুতি রয়েছে। লোডশেডিং যেন কোনো এলাকায় অতিরিক্ত না হয়, সে বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আগাম জানিয়ে লোডশেডিং করার ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বাড়ছে। উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার কারণে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে, বিশেষ করে বয়স্ক ও অসুস্থদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
সব মিলিয়ে, তীব্র গরম ও বিদ্যুৎ সংকট একসঙ্গে দেশের মানুষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
