সামান্য ১৯ হাজার ৩০০ টাকা। সংখ্যায় খুব বড় নয়, কিন্তু সেই টাকার পেছনে লুকিয়ে ছিল এক দরিদ্র পরিবারের শেষ ভরসা। আর সেই সামান্য টাকাই তুলতে গিয়ে এক আদিবাসী ভাইকে যা করতে হয়েছে, তা শুধু একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতার গল্প নয়—এটি এক নির্মম রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার প্রতিচ্ছবি। ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন ও তীব্র প্রতিবাদী একটি লেখা প্রকাশ করেছেন লেখক অর্ক বাদুঁড়ি, যা ইতোমধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
লেখায় তিনি তুলে ধরেন, ভারতের ওড়িশা রাজ্যের কেওনঝড় জেলার মালিপোসি শাখার এক গ্রামীণ ব্যাংকে কিছু সঞ্চয় করেছিলেন করলা মুন্ডা নামের এক নারী। গত ২৬ জানুয়ারি তার মৃত্যু হলে ব্যাংক হিসাবে পড়ে থাকে ১৯ হাজার ৩০০ টাকা। শোকাহত পরিবারটি ভেবেছিল, অন্তত এই সঞ্চিত অর্থটি তুলে নিলে সংসারের কিছুটা উপকার হবে। সেই উদ্দেশ্যেই করলার দাদা জিতু মুন্ডা বারবার ব্যাংকে গিয়ে জানতে চান কীভাবে টাকাটি উত্তোলন করা যাবে।
কিন্তু ব্যাংকের উত্তর ছিল যান্ত্রিক, হৃদয়হীন এবং অবিশ্বাস্য—যার নামে অ্যাকাউন্ট, তাকেই উপস্থিত হয়ে টাকা তুলতে হবে। জিতু মুন্ডা যতই বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে অ্যাকাউন্টধারী তার মৃত বোন, তাকে আর জীবিত অবস্থায় আনা সম্ভব নয়; ব্যাংককর্মীরা ততই নিয়মের খাঁচা দেখিয়েছেন। প্রথাগত শিক্ষার বাইরে থাকা, দরিদ্র, নিরক্ষর এই আদিবাসী মানুষটির যুক্তি কেউ শুনতে চায়নি। মানবিক সহায়তা নয়, তিনি পেয়েছেন কেবল অমানবিক এক বাক্য—“অ্যাকাউন্ট যার, তাকে নিয়ে আসুন।”
এই অপমান আর অসহায়তা একসময় জিতু মুন্ডাকে চূড়ান্ত প্রতিবাদের দিকে ঠেলে দেয়। তিতিবিরক্ত হয়ে তিনি বোনের কবর খুঁড়ে কঙ্কাল বের করেন। তারপর সেই কঙ্কাল কাঁধে নিয়েই সোজা হাজির হন ব্যাংকের ভেতরে। যেন নির্বাক প্রতিবাদ—এই নিন, যাকে চাইছিলেন তাকেই নিয়ে এসেছি, এবার কি টাকা দেবেন?
একটি ব্যাংকের মধ্যে মানুষের কাঁধে কঙ্কাল ঢুকে পড়ার দৃশ্য মুহূর্তে সৃষ্টি করে তোলপাড়। চারদিকে হইচই পড়ে যায়, পুলিশ আসে, প্রশাসনের দৃষ্টি পড়ে, কর্মকর্তাদের টনক নড়ে। কিন্তু প্রশ্ন একটাই—সাড়ে উনিশ হাজার টাকার জন্য একজন মানুষকে কেন মৃত বোনের কবর ভাঙতে হবে? নিয়মের নামে কতটা অমানবিক হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়?
অর্ক বাদুঁড়ি তার লেখায় এই ঘটনাকে কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখেননি; তিনি এটিকে পুরো ব্যবস্থার বিবেকহীনতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন। তার ভাষায়, এ এমন এক দেশ যেখানে দরিদ্র মানুষের আর্তনাদ কেউ শোনে না, যতক্ষণ না সেই আর্তনাদ কঙ্কাল হয়ে প্রতিষ্ঠানের দরজায় গিয়ে দাঁড়ায়। তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন, করলা মুন্ডা মারা গিয়েছিলেন ২৬ জানুয়ারি—যেদিন রাষ্ট্র সাধারণতন্ত্র দিবস পালন করে। অধিকার, সংবিধান, নাগরিক মর্যাদা আর সমতার দিবসেই এক প্রান্তিক নারীর মৃত্যুর পর তার প্রাপ্য অর্থ তুলতে ভাইকে কঙ্কাল কাঁধে ঘুরতে হয়েছে—এ যেন ক্যালেন্ডারেরও নির্মম বিদ্রূপ।
সামাজিক মাধ্যমে অর্ক বাদুঁড়ির এই পোস্ট ছড়িয়ে পড়ার পর বহু মানুষ ক্ষোভ, ব্যথা ও লজ্জা প্রকাশ করেছেন। অনেকে বলছেন, এটি শুধু ওড়িশার ঘটনা নয়; দক্ষিণ এশিয়ার প্রশাসনিক কাঠামোয় দরিদ্র মানুষের প্রতিদিনের বাস্তবতা। যেখানে নিয়ম আছে, কিন্তু মানবিকতা নেই; ব্যাংক আছে, কিন্তু সহানুভূতি নেই; রাষ্ট্র আছে, কিন্তু প্রান্তিক মানুষের জন্য দরজা খোলা নেই।
জিতু মুন্ডার কাঁধে ছিল না শুধু বোনের কঙ্কাল—ছিল হাজারো অবহেলিত মানুষের অপমান, অভিমান আর না-পাওয়া ন্যায্যতার ভার। আর সেই দৃশ্যকে শব্দে রক্তাক্ত করে তুলেছেন অর্ক বাদুঁড়ি। তার লেখাটি এখন শুধু একটি ফেসবুক পোস্ট নয়, এক সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে তোলা নীরব কিন্তু ভয়ংকর প্রশ্নচিহ্ন।
