রোববার, ২৪ মে ২০২৬
Logo
×
একটি বিড়ালের মৃত্যুদণ্ড

একটি বিড়ালের মৃত্যুচিৎকার, আর আমাদের মনুষ্যত্বের নিঃশব্দ মৃত্যু

প্রথম সমাচার ডেস্ক ০৩ মে ২০২৬, ১২:১৫ অপরাহ্ন

আমরা যখন খেতে বসি, আশপাশে ঘুরঘুর করা একটি বিড়ালকে দেখি। ক্ষুধার্ত হলে সে ডাক দেয়, একটু খাবারের আশায় তাকিয়ে থাকে। খুব বেশি ক্ষুধা পেলে হয়তো লুকিয়ে মাছের কাঁটা বা ভাতের টুকরো মুখে দেয়। তার অপরাধ এতটুকুই—সে বাঁচতে চায়। মানুষের মতো সে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে না, দুর্নীতি করে না, ঘুষ নেয় না, প্রতারণা করে না। তবুও এই নিরীহ প্রাণীগুলোর ওপর আমাদের এত নিষ্ঠুরতা কেন?

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ মোড় এলাকায় মাজহারুল নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে একটি বিড়ালকে ফাঁস দিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শুধু হত্যা করেই থামেনি, সেই নির্মম দৃশ্য ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে থাকা ছোট্ট প্রাণীটি ছটফট করছে, ম্যাঁও ম্যাঁও করে বাঁচার আর্তি জানাচ্ছে, দড়ি থেকে নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিন্তু যে মানুষটি তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, তার ভেতরে সামান্যতম করুণা জাগেনি।

একটি প্রাণীর চোখে যখন আতঙ্ক জমে ওঠে, তখন সেখানে ভাষা থাকে না—থাকে শুধু বাঁচতে চাওয়ার আবেদন। সেই বিড়ালটির চোখেও ছিল ঠিক তেমনই অসহায় প্রশ্ন—মানুষ কি সত্যিই এত নিষ্ঠুর হতে পারে? আমরা কি এতটাই অনুভূতিহীন হয়ে গেছি যে একটি জীবন্ত প্রাণীর মৃত্যু যন্ত্রণা দেখে কেউ ভিডিও ধারণ করে, কেউ তা দেখে হাসে, কেউ আবার শেয়ার করে?

ঘটনাটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর প্রাণিপ্রেমী ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে বলছেন, যে ব্যক্তি একটি নিরীহ প্রাণীকে এভাবে নির্যাতন করে হত্যা করতে পারে, তার ভেতরে সহিংসতার যে বীজ আছে, তা সমাজের জন্যও বিপজ্জনক। কারণ নিষ্ঠুরতা কখনো এক জায়গায় থেমে থাকে না; এটি ধীরে ধীরে মানুষকেও গ্রাস করে।

আমাদের সমাজে পশু নির্যাতনকে এখনও অনেকেই ‘তুচ্ছ’ বিষয় মনে করেন। কিন্তু সভ্য সমাজের মানদণ্ডই হলো দুর্বল ও বাকরুদ্ধ প্রাণীর প্রতি আচরণ। যারা নিজের কষ্ট ভাষায় বলতে পারে না, তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে না পারলে মানুষের শিক্ষিত হওয়া, ডিগ্রি অর্জন, বড় বড় কথা বলা—সবই অর্থহীন।

একটি বিড়ালের ফাঁসিতে ঝুলে থাকা দেহ শুধু একটি প্রাণীর মৃত্যু নয়; এটি আমাদের মানবিকতার গলায় পরানো দড়িও। আমরা যদি এই নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে না দাঁড়াই, যদি অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি না করি, তাহলে আগামী দিনে আরও অনেক নিরীহ প্রাণী এমন অমানবিকতার শিকার হবে।

মানুষ হওয়ার আগে মানুষ নামের পরিচয় ধারণ করলেই মানুষ হওয়া যায় না—মায়া, দয়া, সহমর্মিতা না থাকলে সে কেবল দুই পায়ে হাঁটা আরেকটি হিংস্র প্রাণী। আজ প্রশ্ন শুধু ওই বিড়ালটির মৃত্যু নয়, প্রশ্ন—আমাদের ভেতরের মানুষটা এখনও বেঁচে আছে তো?

শেয়ার করুন:
লিঙ্ক কপি হয়েছে
Loading
আরও নিউজ লোড হচ্ছে...